’জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উদযাপন’ উপলক্ষে “জুলাইয়ের অঙ্গীকার, ইনসাফের বাংলাদেশ বিনির্মাণ”–এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ৩৬ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।
গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ৩৬ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করতে এক সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে ইসলামী ছাত্রশিবির।
ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, মিডিয়া সম্পাদক মু’তাসিম বিল্লাহ শাহেদী, প্রকাশনা সম্পাদক আমিরুল ইসলাম, প্রচার সম্পাদক এবং ডাকসুর জিএস এসএম ফরহাদসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
লিখিত বক্তব্যে কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের শহীদ আবু সাঈদ, আলী রায়হান, মুগ্ধ, ওয়াসিম, শান্ত ও শরীফ ওসমান হাদীসহ সকল বীর শহীদ, আহত এবং অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। এ সময় তিনি শহীদদের হত্যার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য সরকারের নিকট জোর দাবি জানান।
ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে বর্তমান সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও গণভোটের ম্যান্ডেটকে বর্তমান সরকার ক্ষমতার মোহে অবজ্ঞা করছে। প্রশাসনে ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসন চলছে এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ গঠনের লক্ষ্যে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল করে বিচার বিভাগকে দলীয় আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক নৈরাজ্যের চিত্র তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেন, বর্তমান সরকারের ৫৯ শতাংশ সংসদ সদস্যই ঋণখেলাপি, যা রাষ্ট্রকে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলেছে। এছাড়া টিআইবি ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সরকার গঠনের প্রথম ১০০ দিনে দেশজুড়ে ৯১৫টি খুন, ২০৯টি ধর্ষণসহ চরম অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষাঙ্গনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম আকাক্সক্ষা ছিল সন্ত্রাসমুক্ত ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা। কিন্তু সরকারদলীয় সংগঠন ছাত্রদল বর্তমানে শিক্ষাঙ্গনে আবারও বর্বরোচিত সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর প্রকাশ্য হামলা চালানো হচ্ছে।
সাংবাদিক সম্মেলন থেকে নিম্নোক্ত ৩৬ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়-
গণভোটের রায় ও জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং গণহত্যার বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী ‘অদম্য জুলাই’ শিরোনামে মাসব্যাপী বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ আয়োজন, রক্তাক্ত জুলাইয়ের স্মৃতি নিয়ে গল্প, উপন্যাস, গবেষণা প্রবন্ধ ও সাময়িকী প্রকাশ, রাজধানীতে “শিশুদের চোখে জুলাই জাগরণ” শীর্ষক প্রদর্শনীর আয়োজন, “জুলাই জাগরণ” ডকুফিল্ম প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী আয়োজন, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, রিসার্চ কনফারেন্স, আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন, সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক প্লেসে “জুলাইয়ের অঙ্গীকার, ইনসাফের বাংলাদেশ বিনির্মাণ” শীর্ষক আলোকচিত্র ও ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী এবং সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা আয়োজন, জুলাইয়ের স্মৃতি বলা, স্মৃতিলিখন, বক্তব্য, রচনা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা প্রভৃতি আয়োজন, নিজ নিজ জেলায় শহীদদের নামে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা,“জুলাই শহীদ স্মৃতি” ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন, শহীদ পরিবার, আহত ও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী গাজীদের নিয়ে “লাল জুলাই” শীর্ষক সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও পডকাস্টের আয়োজন, শহীদদের কবর জিয়ারত, শহীদ পরিবার ও আহতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং মতবিনিময়, জুলাই গ্রাফিতি অঙ্কন ও “ Echoes of July ” শিরোনামে ৩৬ দিনব্যাপী অনলাইন ক্যাম্পেইন পরিচালনা।
জুলাইয়ের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে ঘোষিত কর্মসূচিসমূহ ছাত্রশিবিরের সকল বিশ্ববিদ্যালয়, মহানগর ও জেলা শাখার তত্ত্বাবধানে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে বলে জানান শিবির সভাপতি।
পরিশেষে, কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ক্ষমতালিপ্সার কাছে অভ্যুত্থানের অর্জনকে ব্যর্থ হতে না দিয়ে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। আগামী ৩৬ দিনব্যাপী ঘোষিত কর্মসূচি সফল করতে ছাত্রশিবিরের জনশক্তি, ছাত্রসমাজ এবং দেশবাসীর সার্বিক সহযোগিতা কামনা করে সংবাদ সম্মেলন সমাপ্ত করা হয়।