বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, কক্সবাজারের পর্যটন, সমুদ্রসম্পদ, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ, লবণ শিল্প, কৃষি, মৎস্য, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সমন্বিত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা গেলে কক্সবাজার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হবে। কিন্তু বহুমুখী এই সক্ষমতা এবং সম্ভাবনা অবনতিশীল নিয়ন্ত্রণহীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।এতে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে নানাবিধ উন্নয়ন কার্যক্রম।
গতকাল সোমবার দুপুরে কক্সবাজার জেলা জামায়াতের কার্যালয়ে জেলা জামায়াত আয়োজিত ‘কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উন্নয়ন ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি উপরোক্ত কথাগুলো বলেন।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া সংস্কার, সুশাসন ও জবাবদিহিতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পরিবর্তে সরকার দলীয়করণে ব্যস্ত। নির্বাচনের চার মাস পরও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি; গুম কমিশন, মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে মৌলিক সরকার সংস্কারের পথ সংকুচিত করেছে। তিনি বর্তমান বাজেটকে ঋণনির্ভর ঘাটতি বাজেট উল্লেখ করে বলেন, অতীতে ৪ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় সম্ভব না হলেও এবার প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, অথচ সুশাসন প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা হয়নি।
ড. হামিদ আযাদ বলেন, কক্সবাজারে সুয়্যারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট না থাকায় বর্জ্য সাগরে গিয়ে পরিবেশ দূষণ করছে; অপরিচ্ছন্ন সৈকত, অপরিকল্পিত দালাল, হকার, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও পর্যটন অব্যবস্থাপনায় পর্যটকেরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। কুতুবদিয়া-মগনামা ঘাট, মহেশখালী জেটি ও কক্সবাজার ৬ নম্বর জেটির জরাজীর্ণ অবস্থা, তীব্র যানজট, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দুর্ঘটনা, লবণ সিন্ডিকেট, কৃষকের ন্যায্যমূল্য বঞ্চনা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাব, শিক্ষক সংকট, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, উপকূলে জলদস্যুতা, অপহরণ, মাদক, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার চাপ জেলার উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি সোনাদিয়ার প্যারাবন ও পাহাড় উজাড় এবং ভূমি অধিগ্রহণ ও মেগা প্রকল্পে দুর্নীতি-অনিয়ম উদ্বেগজনক।
তিনি কক্সবাজারের উন্নয়নে ভূমি প্রশাসন, ইউনিয়ন ও পৌরসভার সেবা শতভাগ ডিজিটালাইজেশন, পুলিশ ও প্রশাসনের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, নিয়মিত গণশুনানি, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মেগা প্রকল্পে স্থানীয়দের জন্য অন্তত ৫০ শতাংশ ব্যবসা ও কর্মসংস্থান সংরক্ষণ, ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন, লবণ সিন্ডিকেট নির্মূল, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, কুতুবদিয়া-মগনামা ঘাট ও কক্সবাজার ৬ নম্বর জেটির দ্রুত সংস্কার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর উন্নয়ন, সোনাদিয়ার প্যারাবন সংরক্ষণ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা নুর আহমদ আনোয়ারী বলেন, দীর্ঘ দুঃশাসনের পর মানুষ নতুন সরকারের কাছে স্বস্তি প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সারাদেশে অস্থিরতা বেড়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। তিনি অভিযোগ করেন, টেকনাফে দিনদুপুরে অপহরণ, মানবপাচার, মুক্তিপণ আদায়, চাঁদাবাজি ও মাদকের বিস্তার জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
কক্সবাজার শহর জামায়াতের ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার ১ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল ফারুক ২৪-এর গণ অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণ করে বলেন, জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখলেও কক্সবাজার উন্নয়নের বৈষম্যের শিকার।
তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতি জনগণ মেনে নিতে পারছে না। এমনকি সরকারপ্রধানের সফরের দিনও চকরিয়া-পেকুয়ায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি। তিনি প্রশ্ন রাখেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী আছে?
জেলা জামায়াতের সাংগঠনিক সেক্রেটারি আল আমীন মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম। সাংবাদিকদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারী, দৈনিক ইনকিলাব কক্সবাজার অফিস প্রধান শামসুল হক শারেক, এনটিভি কক্সবাজার প্রতিনিধি ইকরাম চৌধুরী টিপু, বাংলাদেশ প্রতিদিন কক্সবাজার প্রতিনিধি হাসানুর রশীদ, বণিক বার্তা কক্সবাজার প্রতিনিধি ছৈয়দ আলম ও চ্যানেল নাইন কক্সবাজার প্রতিনিধি শেখ সেলিম। এসময় জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর মুফতী মাওলানা মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ, সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা দেলোয়ার হোছাইন, কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি সিনিয়র সাংবাদিক কামাল হোসেন আজাদ, দৈনিক নয়াদিগন্তের জেলা প্রতিনিধি জিএএম আশেক উল্লাহসহ জেলার বিভিন্ন ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ার প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।