মোঃ রেজাউল বারী বাবুল, গাজীপুর : একসময় গাজীপুরের প্রাণ ছিল চিলাই, শীতলক্ষ্যা, বানার,বালু ও তুরাগ নদী। এই নদী গুলো ঘিরেই গড়ে উঠেছিল জনপদ, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও স্থানীয় অর্থনীতি। বর্ষাকালে নদীর বুকে বইত স্বচ্ছ স্রোত, দুই তীর ছাপিয়ে পানি ছড়িয়ে পড়ত আশপাশের বিল-ঝিল ও নিম্নাঞ্চলে। নদীতে চলত নৌকা, জেলেরা ধরতেন দেশীয় প্রজাতির মাছ, কৃষকের মাঠে মিলত উর্বর পলি। চিলাইসহ সেই নদী গুলো আজ যেন মৃত্যুপথযাত্রী। শিল্পবর্জ্য, দখল, ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে নদীগুলো ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক প্রবাহ, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জীবনীশক্তি।

গাজীপুরের এসব নদীর সঙ্গে সংযুক্ত অসংখ্য খাল, বিল ও জলাশয়ও একই সংকটে পড়েছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আগামী এক দশকের মধ্যে এ অঞ্চলের পরিবেশগত ক্ষতি অপূরণীয় হয়ে উঠতে পারে।

অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ভার বইছে প্রকৃতি

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল গাজীপুর। এখানে হাজার হাজার পোশাক কারখানা, টেক্সটাইল, ডাইং, ওয়াশিং, রাসায়নিক, ফার্মাসিউটিক্যাল, প্লাস্টিক, খাদ্য ও বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। শিল্পায়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে তার বড় মূল্য দিচ্ছে প্রকৃতি ও মানুষ।

পরিবেশ আইন অনুযায়ী, দূষণকারী শিল্পকারখানায় ইটিপি বা বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন ও নিয়মিত পরিচালনা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে অভিযোগ রয়েছে, অনেক কারখানা ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য ইটিপি চালু রাখে না। কোনো কোনো কারখানায় শুধু পরিদর্শনের সময় ইটিপি চালানো হয়, আবার অনেকেই গোপন পাইপলাইন বা ড্রেনের মাধ্যমে অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি নদী, খাল, বিল কিংবা নিম্নাঞ্চলের জলাশয়ে ফেলে দেয়।

ফলে কালো, দুর্গন্ধযুক্ত ও বিষাক্ত বজের্য নদীর পানি রঙ পরিবর্তন করছে। কোথাও পানি লালচে, কোথাও কালচে, আবার কোথাও রাসায়নিক ফেনায় ঢেকে যাচ্ছে নদীর বুক।

মরছে মাছ, হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য

একসময় চিলাই নদী ও আশপাশের বিলগুলো ছিল দেশীয় মাছের নিরাপদ আবাসস্থল। রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল, শিং, মাগুর, কৈ, টেংরা, পাবদা, গজার, টাকি, চিংড়িসহ অসংখ্য দেশীয় প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত।

বর্তমানে দূষণের কারণে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ মাছ ভেসে ওঠার ঘটনাও ঘটছে। নদীভিত্তিক জীববৈচিত্র্য দ্রুত বিলুপ্তির পথে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীববৈচিত্র্যের বাস্তুতন্ত্র। নদী মারা গেলে তার সঙ্গে হাজারো প্রাণী, উদ্ভিদ ও পরিবেশগত ভারসাম্যও ধ্বংস হয়ে যায়।

কৃষিজমিও হচ্ছে বিষাক্ত

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিল্পবর্জ্য শুধু নদীতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। দূষিত পানি সেচের মাধ্যমে কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে এবং জমিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি বাড়ছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-এর বিজ্ঞানীরা গাজীপুরের দূষণপ্রবণ এলাকার বিভিন্ন কৃষিজমির মাটি পরীক্ষা করে উদ্বেগজনক তথ্য পেয়েছেন। তাদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, কিছু এলাকায় মাটিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত নিরাপদ সীমার তুলনায় বিভিন্ন ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতি অনেক বেশি।

বিজ্ঞানীদের মতে, এসব দূষিত মাটিতে উৎপাদিত ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করলে তা দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

মানুষের শরীরে নীরব বিষ

চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারী ধাতু ও শিল্পবজের্যর বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান দীর্ঘদিন শরীরে প্রবেশ করলে কিডনি, লিভার, ফুসফুস ও স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

এ ধরনের দূষণের কারণে ক্যান্সার, কিডনি বিকল, জন্মগত ত্রুটি, হরমোনজনিত সমস্যা, শ্বাসকষ্ট, ত্বকের রোগসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ে। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

খাল-বিল ভরাটে বাড়ছে জলাবদ্ধতা

শিল্পবজের্যর পাশাপাশি খাল দখল ও ভরাটের কারণে গাজীপুরের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। অনেক খাল সংকুচিত হয়ে গেছে, কোথাও পুরোপুরি ভরাট হয়ে স্থাপনা গড়ে উঠেছে।

বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে রাস্তা, ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নদীর সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাস

গাজীপুরের নদ-নদী শুধু জলধারা নয়, এগুলো গাজীপুরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ। বহু গ্রাম, বাজার, নৌপথ ও জনপদ এই নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল।

বয়োজ্যেষ্ঠরা বলেন, একসময় নদীতে পালতোলা নৌকা চলত, বর্ষায় নৌকাবাইচ হতো, জেলেরা নদী থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। আজ সেই নদীর অনেক অংশে হাঁটাও সম্ভব। কোথাও পানি নেই, কোথাও কালো বজের্যর স্তূপ।

একজন প্রবীণ বাসিন্দার ভাষায়, ‘আগে নদী আমাদের বাঁচিয়ে রাখত, এখন আমরা নদীকে বাঁচাতে পারছি না।’

গাজীপুর জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আরেফিন বাদল বলেন, শিল্পায়নের কারণে দেশের অন্যতম পরিবেশগত ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় পরিণত হয়েছে গাজীপুর। বর্তমানে জেলায় পরিবেশগত ছাড়পত্রপ্রাপ্ত শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার। এত বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত কার্যক্রম তদারকির তুলনায় জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের জনবল, যানবাহন ও কারিগরি সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত।

তিনি জানান, সীমিত জনবল ও সরঞ্জাম নিয়েও পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান ও আইন প্রয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ২০২৬ সালের জুন মাসে জেলা পর্যায়ে দুটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে শব্দদূষণবিরোধী এক অভিযানে দুটি যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং তিনটি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হয়। একই মাসে ব্যাটারি ও সীসা দূষণবিরোধী আরেকটি অভিযানে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে একটি জেনারেটর জব্দ করা হয়।

এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের সদর দপ্তরের এনফোর্সমেন্ট উইং জুন মাসে গাজীপুরের ৯টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে মোট ৭ লাখ ৬১ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা আদায় করে। একই সময়ে ২১টি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ সংক্রান্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হয় এবং ৮টি নথি পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থার জন্য সদর দপ্তরে প্রেরণ করা হয়।

বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, মোঃ মনির হোসেন বলেন, ‘গাজীপুরের অধিকাংশ নদী আজ দখল, ভরাট ও শিল্পবজের্যর নির্মম আগ্রাসনে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একসময় যেসব নদী এ অঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও জনজীবনের প্রাণ ছিল, সেগুলো আজ অনেক স্থানে সরু নালায় পরিণত হয়েছে। নদী ও নদীর ফোরশোর দখল করে শিল্পকারখানা, আবাসন প্রকল্প, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য, রাসায়নিক বর্জ্য ও বিভিন্ন ধরনের দূষণ নদীর পানি, তলদেশ এবং আশপাশের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর ফলে শুধু নদী নয়, কৃষিজমি, জলাশয়, ভূগর্ভস্থ পানির উৎস এবং জনস্বাস্থ্যও হুমকির মুখে পড়েছে।’

আইন আছে, প্রয়োগ নেই

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, পানি আইন এবং বিভিন্ন পরিবেশগত বিধিমালায় শিল্পবর্জ্য পরিশোধন ছাড়া নির্গমনের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

তবুও বাস্তবে নিয়মিত নজরদারি, মনিটরিং ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরিবেশবাদীদের মতে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত অভিযান, নিয়মিত পরিবেশ পর্যেবক্ষণ এবং দায়ী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।

যা করা জরুরি

বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজীপুরের নদী ও পরিবেশ রক্ষায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি- সব শিল্পকারখানায় কার্যকর ইটিপি চালু নিশ্চিত করা। গোপন বর্জ্য নির্গমন লাইন শনাক্ত করে বন্ধ করা।নদী, খাল ও বিলের দখল উচ্ছেদ এবং পুনঃখনন করা। নিয়মিত পানি ও মাটির মান পরীক্ষা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা।পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য পরিবেশগত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। স্থানীয় জনগণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনকে পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা।

এখনই উদ্যোগ না নিলে ভয়াবহ সংকট

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতি একদিনে চোখে পড়ে না। কিন্তু বছরের পর বছর দূষণ চলতে থাকলে তার প্রভাব ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নদী মরে গেলে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়বে, খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবাহে চিলাইসহ গাজীপুরের নদ-নদীগুলো সাময়িকভাবে কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়। তবে বর্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার শিল্পকারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্যের বিষাক্ত ছোবলে নদীগুলো দূষিত হয়ে পড়ে। নদীর পানি কালচে ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে ওঠে, যা শুধু জলজ প্রাণীর জন্যই নয়, মানুষের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষাকালেও এসব নদীর পানিতে গোসল বা নামলে অনেকের শরীরে চুলকানি, অ্যালার্জি, চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দেয়। ফলে নদী এখন আর স্বস্তি বা জীবিকার উৎস নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

নদীকে রক্ষা করা মানে গাজীপুরের পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাকে রক্ষা করা।