জীবিকার তাগিদ আর জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ অভিঘাতে রাজধানী ঢাকা এখন এক জ্বলন্ত জনমিতিক সংকটের মুখোমুখি। তীব্র জনস্ফীতি এবং সে তুলনায় ভৌত ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় ঢাকা এখন এক অচল ও অবরুদ্ধ শহরে পরিণত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ নতুন মানুষের চাপে পিষ্ট মেগাসিটি ঢাকা। জাতিসংঘের সাম্প্রতিকতম ডেমোগ্রাফিক ও বৈশ্বিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই শহরের জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৬ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, যা ঢাকাকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেগাসিটিতে পরিণত করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়াবে ৫ কোটি ২১ লাখে। তখন ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তাকে টপকে ঢাকা হবে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল মেগাসিটি। তবে ৫ কোটির এই ঢাকা কি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতীক হবে, নাকি নিজের ওজনের চাপে ভেঙে পড়া এক ভয়াবহ ‘মানব বোমায়’ পরিণত হবে আজ সেই প্রশ্নই সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদের কাছে। তারা বলেন, জনসংখ্যা বিস্ফোরণের চাপে ঢাকা কি অচল হয়ে পড়বে? নাকি জনসংখ্যার চাপে ধ্বংসের মুখে পড়বে দেশের অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ড? ২০৫০ সালে ৫ কোটির ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখতে হলে আমাদের চিরাচরিত উন্নয়ন ভাবনায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। ঢাকাকেন্দ্রিক মেগা প্রজেক্টের মোহ কাটিয়ে সারা দেশকে উন্নত করার সমন্বিত নীতি গ্রহণ করতে হবে। যদি আমরা এখনই জাতীয় স্তরে সাহসী ও সুদূরপ্রসারী বিকেন্দ্রীকরণ নীতি বাস্তবায়ন করতে না পারি, তবে ঢাকার এই অনিয়ন্ত্রিত জনবিস্ফোরণ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে থামিয়ে দেবে। ঢাকাকে বাঁচানোর লড়াই আসলে পুরো বাংলাদেশকে বাঁচানোর লড়াই।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও নগর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২,০০০ মানুষ ঢাকায় পাড়ি জমায়, যাদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই আসে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ (যেমন নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়) এবং জীবিকা হারানোর কারণে। এই হিসাবের অনুপাত অনুযায়ী, প্রতি মাসে প্রায় ৩.৫ লাখ থেকে ৪ লাখ নিম্ন-আয়ের মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তু বা অভিবাসী হিসেবে ঢাকায় প্রবেশ করে। বিগত এক দশকের (২০১৬-২০২৬) হিসাব বিবেচনা করলে দেখা যায়, শুধুমাত্র জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে বাস্তুচ্যুত হয়ে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ মানুষ ঢাকা মহানগরী ও এর আশেপাশের অনানুষ্ঠানিক বসতি বা বস্তিগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস মেয়র্স মাইগ্রেশন কাউন্সিলের একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা শহর ইতোমধ্যে বিভিন্ন সময় মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) জলবায়ু অভিবাসীকে আশ্রয় দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৯৯ লাখ (১৯.৯ মিলিয়ন) মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে জলবায়ু অভিবাসীতে পরিণত হতে পারে, যার একটি বিশাল অংশ শেষ পর্যন্ত ঢাকার ওপরই চাপ সৃষ্টি করবে।

সূত্রে জানাযায়, গত এক দশকে ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বিশ্বের যেকোনো মেগাসিটির চেয়ে দ্রুততম ছিল। ২০১৪-২০১৫ সালে যেখানে জাতিসংঘের সংজ্ঞায় ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখের কাছাকাছি, ২০২৬ সালে এসে তা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখে। অর্থাৎ, বিগত দশ বছরে ঢাকা ও এর সংলগ্ন মেট্রোপলিটন এলাকায় প্রায় ২ কোটির কাছাকাছি নতুন মুখ যুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারি অনুসারে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক সীমানার মধ্যে জনসংখ্যা ১ কোটি ৩ লাখ এবং পুরো জেলায় ১ কোটি ৪৭ লাখ। তবে বর্তমান নগর প্রশাসকদের দাবি, প্রতিদিনের ভাসমান ও কর্মজীবী জনসংখ্যাসহ এই দুই সিটির প্রকৃত জনসংখ্যা এখনই ২ কোটির কাছাকাছি। মূলত প্রশাসনিক সীমানার সংকীর্ণতার কারণেই সরকারের স্থানীয় ডেটার সাথে জাতিসংঘের বৈশ্বিক রিপোর্টের এই বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়।

ঢাকায় মানুষ বাড়ার মূল কারণ সম্পর্কে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং বিশ্বব্যাংকের জলবায়ু সংক্রান্ত যৌথ গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। এর সিংহভাগেরই শেষ গন্তব্য হচ্ছে ঢাকা। জলবায়ু অভিবাসনমুখীদের স্রোত ঢাকার দিকে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার আগ্রাসন, তীব্র খরা এবং উপর্যুপরি ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি দেশের উত্তরাঞ্চল ও নদী অববাহিকায় ভয়াবহ নদীভাঙনের শিকার লাখো পরিবার তাদের শেষ সম্বল হারিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমাচ্ছে। গ্রামে বা মফস্বল শহরে বিকল্প জীবিকার অভাব এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির প্রায় ৬০ শতাংশ ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় সাধারণ মানুষ রিকশা চালানো, গৃহস্থালির কাজ কিংবা পোশাক খাতের সাধারণ শ্রমের খোঁজে বাধ্য হয়ে এই শহরে আসছে। বৈশ্বিক র‌্যাংকিং ও কারণ সমূহইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) থেকে শুরু করে একাধিক বৈশ্বিক সূচকে বাসযোগ্যতার দিক থেকে ঢাকা বছরের পর বছর ধরে নিচের দিকে অবস্থান করছে। ঢাকা এখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান বসবাসের অযোগ্য মেগাসিটি। এই তীব্র বাসযোগ্যতাহীনতার পেছনে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছেন। ১. প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৪৫ হাজারেরও বেশি মানুষের বসবাস এই শহরকে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পরিণত করেছে। ২. বিষাক্ত ধূলিকণা ও বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমনে ঢাকা প্রায়ই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় শীর্ষে থাকে। ৩. ঢাকার চারপাশে থাকা খাল এবং বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো দখল ও বর্জ্য দূষণে মৃতপ্রায়। সামান্য বৃষ্টিতেই তৈরি হচ্ছে তীব্র জলাবদ্ধতা। ৪. মশক নিধন, তীব্র যানজট, অপর্যাপ্ত গণপরিবহন, অনিরাপদ পানি সরবরাহ ও আবাসন সংকট ঢাকাকে একটি অচল নগরে রূপ দিচ্ছে।

জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালে ৫ কোটি ২১ লাখের ঢাকা মেগাসিটির আওতায় নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার ও কেরানীগঞ্জ পুরোপুরি একীভূত হয়ে এক বিশাল কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হবে। যদি এখনই নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ২০৫০ সালে ঢাকা যেসব সংকটে পড়বে। তা হলো: ১. যানজটের কারণে শহরের গড় যাতায়াতের গতি নেমে আসতে পারে মাত্র ২ থেকে ৩ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় (যা মানুষের হাঁটার গতির চেয়েও কম)। ২. ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কয়েকশ ফুট নিচে নেমে যাওয়ায় সুপেয় পানির তীব্র হাহাকার তৈরি হবে এবং দৈনিক টন টন কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাইরে চলে যাবে। ৩. কংক্রিটের অতি-ব্যবহারের কারণে ঢাকার তাপমাত্রা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের চেয়ে ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি থাকবে।

ঢাকার বাড্ডার একটি বস্তিতে বসবাসকারী জলবায়ু অভিবাসী রহমত আলী (৪৫) নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২০০৭ সালের সিডরে আমাগো জমিবাড়ি সব কীর্তনখোলা নদীতে চইলা গেছে। পেটের দায়ে ঢাকায় আইসা রিকশা চালাই। এখানে বস্তিতে এক ঘরের ভাড়া ৫ হাজার টাকা, তার ওপর পানি পাই না, একটু বৃষ্টি হইলেই ঘরের মধ্যে নোংরা পানি ঢোকে। আমাগো মতো গরিব মানুষের জন্য ঢাকা এক সংকটের জায়গা।

খিলগাঁও এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা ও গৃহিণী সুফিয়া বেগম বলেন, আগে ঢাকা অনেক শান্ত ছিল। এখন সকাল থেকে শুরু হয় তীব্র গাড়ির হর্ন আর কালো ধোঁয়া। বাচ্চাদের খেলার কোনো মাঠ নেই, একটু শ্বাস নেওয়ার জায়গা নেই। এই শহরে আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসছে।

বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঢাকার মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ইতিমধ্যে মস্ত বড় বাধা সৃষ্টি করছে। ২০৫০ সালে জনসংখ্যা যদি সত্যিই ৫ কোটি ছাড়িয়ে যায়, তবে রাজধানী কার্যত একটি ‘মানব বোমায়’ পরিণত হতে পারে। এই আসন্ন মহাবিপর্যয় মোকাবিলা করতে এবং বাড়তে থাকা জনসংখ্যাকে বোঝা না বানিয়ে জনসম্পদে রূপান্তর করতে হলে এখনই সম্পূর্ণ নতুন নগরনীতি ও সমন্বিত টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

রাজউকের ড্যাপ প্রকল্পের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ঢাকা শহরের ওপর চাপ কমাতে সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ ও স্যাটেলাইট সিটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে মূল সমস্যা হলো, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলো এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক। ঢাকার বাইরে সমপর্যায়ের নাগরিক সুবিধা ও কর্মসংস্থান তৈরি করা না গেলে কেবল আইন করে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত বন্ধ করা সম্ভব নয়।

এই আসন্ন ধ্বংসযজ্ঞ থেকে ঢাকাকে রক্ষা করতে হলে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক নগর পরিকল্পনার আলোকে সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির। তিনি বলেন, সরকারি প্রধান প্রধান দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানাগুলোকে (যেমন: গার্মেন্টস শিল্প) ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে স্থানান্তরিত করতে হবে। দেশের অন্য ৭টি বিভাগীয় শহর এবং জেলা সদরগুলোতে মানসম্মত শিক্ষা, বিশেষায়িত চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ ঢাকামুখী হতে বাধ্য না হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় ও নদী অববাহিকার জেলাগুলোতে বিশেষ কর্মসংস্থান জোন তৈরি করতে হবে, যেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ নিজ অঞ্চলেই পুনর্বাসিত হতে পারে। মূল ঢাকার ওপর চাপ কমাতে সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জকে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং পরিকল্পিত উপশহর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে বাসিন্দাদের দৈনিক কাজের জন্য মূল ঢাকায় প্রবেশ করতে না হয়।