ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়িয়ে থাকে আস্থা আর সেবার উপর ভিত্তি করে। কিন্তু আমরা গত ফ্যাসিস্ট আমলে দেখেছি কিভাবে ব্যাংকগুলো রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। দেশে ব্যাংকের ক্ষেত্রে অর্থনীতি যেমন আছে, রাজনীতিও আছে প্রবলভাবে। আওয়ামী লীগের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যেমনটা বলেছিলেন, নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। উদাহরণ দিয়ে আরও বলা যায়, ব্যাংকে একটি পরিচালনা পর্ষদ থাকবেÑএটি অর্থনৈতিক বিষয়, কিন্তু পর্ষদে এক পরিবার থেকে পাঁচজন সদস্য টানা নয় বছর থাকবেনÑএটি কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আবার খেলাপি হলে ব্যাংক তা আদায়ের ব্যবস্থা করবে, এটি অর্থনৈতিক বিষয়, কিন্তু খেলাপিদের আবার ঋণ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া অবশ্যই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

গত এক যুগের প্রধান ঘটনাগুলো তালিকা করলে প্রথমেই আসবে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনা। এরপরই বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, জনতা ও প্রাইম ব্যাংকে বিসমিল্লাহ গ্রুপের অনিয়ম, জনতা ব্যাংকের অ্যাননটেক্স ও ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ অনিয়ম। এছাড়া আলোচিত ঘটনাগুলোর অন্যতম ফারমার্স ব্যাংকের অনিয়ম, ইউনিয়ন ব্যাংকের বেনামি ঋণ, ইসলামী ব্যাংকের ভয়ঙ্কর নভেম্বর, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ঘটনা। আবার ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ অনিয়মের ঘটনা কয়েক বছর ধরেই আলোচনায়। এসব অনিয়মে ভূমিকা রেখেছে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে জোরপূর্বক কয়েকটি ব্যাংকের মালিকানা দখল। নানা ছলে ব্যাংক দখল হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চোখের সামনে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। গুটিকয়েক ব্যাংকের মালিকদের আজীবন পরিচালক রাখার জন্য বিগত সরকার যেভাবে আইন পরিবর্তন করেছে, তা সবারই জানা।

এখানে ব্যাংক খাত নিয়ন্ত্রণ করে এমন সব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, যাদের আসল আগ্রহ অন্যত্র। এখানে রাজনীতি করা বিশিষ্টজন এবং বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের মালিকেরা ব্যাংকের পরিচালক হয়ে বসে আছেন। ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কিতদের নিজের ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে কিছু বিধিনিষেধ আছে ঠিকই, তবে তা কেবল কাগজে-কলমে। যেমন একজন ব্যাংকের পরিচালককে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি ঋণ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পাশ কাটিয়ে এর চেয়ে বেশি ঋণ তাঁরা অন্য ব্যাংক থেকে নেন। এভাবে ঋণ নেওয়ার হার এখন বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে গেছে।

এসব পরিচালক যখন আর্থিক সমস্যায় পড়েন, তখন আত্মীয়স্বজনের নামে ঋণ নিয়ে নিজের খেলাপি ঋণ নিয়মিত করে নেন। এভাবে তাঁরা পরিচালকের পদ রক্ষা করেন এবং আজীবন নিয়মিত ঋণগ্রহীতা হিসেবে টিকে থাকেন। ব্যাংক খাতে জালিয়াতির যেসব ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে, তা এ ধরনের কর্মকাণ্ডেরই প্রমাণ। যেমন গত এক দশকের বেশি সময়ে ব্যাংক পরিচালকদের যোগসাজশে ঘটা জালিয়াতির কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ খুইয়েছে এমন উদাহরণের মধ্যে আছে সোনালী ব্যাংক (২০১০-১২ সময়ে আত্মসাৎ ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি), বেসিক ব্যাংক (২০০৯-১৩ সময়ে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা) এবং সাবেক ফারমার্স ব্যাংক (এখন পদ্মা ব্যাংক, ৩ হাজার ৭০ কোটি টাকা)।’

ব্যাংক খাত নিয়ে এখানে মানুষের আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে। আমানত তুলে নেবেন কি না, এ রকম কিছু উদ্বিগ্ন মানুষের প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন। আমানত তুলে নেওয়া ঠেকাতে এখন নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিছু ব্যাংক গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আদিষ্ট হয়ে ব্যাংকের এমডিরা সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন বা লেখালেখিও করছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিজ্ঞপ্তি দিয়েও আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে।

সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যাংক খাত আসলেই সমস্যার মধ্যে আছে। আছে সুশাসনের প্রবল ঘাটতি। ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রকদের আছে হরেক রকমের দুর্বলতা। যথাযথ ব্যাংক সংস্কার কমিশনের অভাব, দুর্বল করপোরেট শাসনব্যবস্থা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ, আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাব এবং স্বচ্ছতার অভাব বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে। এর পাশাপাশি এখন নীতিনির্ধারকদের উচিত আয়নায় নিজেদের চেহারাটাও দেখে নেওয়া। ব্যাংক খাত নিয়ে আস্থার সংকট বা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার জন্য দায়ী মূলত তাঁরাই। বছরের পর বছর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ও প্রভাবশালীদের খুশি রাখতে এ খাতে কোনো সংস্কার করা হয়নি।

বর্তমান সংসদেও আমরা দেখতে পাই, ব্যাংক নিয়ে সংসদ সদস্যদের নানা রকম দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য। কিন্তু গ্রাহকরা চায় আশার বানী শুনতে। এক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর জাতীয় সংসদে ব্যাংক রেজুলেশন আইন পাশের আগে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেওয়া ১৮ (ক) ধারাটি শেষ পর্যন্ত বাদ দেওয়ার ঘোষণা গ্রাহকদের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে দেবে বলে বিশ্বাস করি। তাছাড়া ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শাস্তি দেওয়া না হলেও ব্যাংক খাত ঘুরে দাঁড়াবে না।