মসজিদ; উপাসনালয়, মাদরাসা, লিল্লাহ বোর্ডিং সহ সকল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সকল শ্রেণির মানুষের সুদৃষ্টি রয়েছে। আবহমান কাল থেকেই এসব প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র, সমাজের ধর্মপ্রাণ ও বিত্তবান মানুষের আর্থিক সাহায্য বা অনুকূলে পরিচালিত হয়ে আসছে। এমনকি অনেকে এসব প্রতিষ্ঠানে আর্থিক আনুকূল্য দেয়ার জন্য নিজেদের স্থায়ী সম্পত্তি ওয়াকফ বা দানপত্র করার রেকর্ড নেহায়েত কম নয়। কিন্তু সম্প্রতি বিষয়টিকে ভিক্ষাবৃত্তির অনুসঙ্গে পরিণত করা হয়েছে। যা অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক। এ বিষয়ে নিজের একটা বাস্তব অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েই আজকের নিবন্ধ শুরু করছি।

সকালে হাঁটতে বের হলেই হাতিরঝিল ওভার ব্রিজের সিঁড়ির নিচে ইট-সিমেন্টের বেঞ্চিতে চাঁদা আদায়ের রসিদ ও খাতা হাতে একজন বয়স্ক মানুষ দেখা মেলে। বেশভূষায় বেশ কেতাদুরস্ত; আরবীয় শায়েখ স্টাইলের পোশাক। তার মুখে একটিই কথা, ‘মসজিদ, মাদরাসা আর লিল্লাহ বোর্ডিং-এর জন্য দান করুন’। একেবারে সাত-সকালে নিজের আরাম-আয়েস সহ সকল কাজ ফেলে তার কেন এমন গরজ পরলো মসজিদ, মাদরাসা আর লিল্লাহ বোর্ডিং-এর জন্য অর্থসংগ্রহের? তার কি স্ত্রী-সন্তান; ঘর সংসার নেই? নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর উদ্দেশ্যই বা কী?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ ধরনের সাহায্যপ্রার্থীরা মূলত সেবা বা পরোপকারের জন্য এসব করেন না বরং নিজের গরজেই বা বিশেষ উদ্দেশ্যেই এ কাজ করে থাকেন। কেউ কেউ দাবি করেছেন এটা তার চাকুরী তথা পেশা। মসজিদ, মাদরাসা বা লিল্লাহ বোর্ডিং-এর জন্য যা আদায় করতে পারেন এর অংশ বিশেষ তাকে কমিশন দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এটাই তার জীবন ও জীবিকা। প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক নয় যে, এমন একটি কাজকে তিনি পেশা হিসাবে কেন বেছে নিলেন? জীবন চলার জন্য তার কী কোনো কাজ নেই; আর এ পেশার ভবিষ্যৎই বা কী? আর মসজিদ, মাদরাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিং-এর জন্য এভাবে পথে ঘাটে ভিক্ষা চাইতে হবে কেন? আবহমান কাল থেকেই এসব মহতি কাজের জন্য সহায্য চাওয়া ও দেয়ার নানাবিধ স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি রয়েছে। অন্য কোনো ধর্মের উপাসনালয় ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমনটা কখনো দেখা যায় না। তাই বিষয়টিকে ভিক্ষাবৃত্তির সাথে তুলনা করা যায় কি না সে প্রশ্নও একেবারে অবান্তর নয়; বরং খুবই যৌক্তিক।

আবার এসব আদায়কারীর বিরুদ্ধে ভিন্নতর অভিযোগও রয়েছে। জনশ্রুতি রয়েছে যে, মাদরাসা, মসজিদ ও লিল্লাহ বোর্ডিং-এর নামে পথেঘাটে যেসব আদায়কারীরা আদায় করেন, তাদের অধিকাংশই ভুয়া। এসব আদায়ের সাথে উল্লেখিত ধর্মীয় বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কোন সম্পর্ক নেই বরং এরা প্রতারক। এদের দৌরাত্ম্য বাস, ট্রেন ও লঞ্চ সহ বিভিন্ন গণপরিবহনে দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে নিজেরাই আদায়ের রসিদ ছাপিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষের অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে এরা ব্যবসা করেন।

এবার আসি মসজিদের কথায়। আমাদের দেশ মুসলিম প্রধান। সঙ্গত কারণেই এদেশ মসজিদের দেশ। ঢাকা নগরীকে তো মসজিদের নগরী বলা হয়। প্রত্যেক পাড়া-মহল্লা ও লোকালয়ে মসজিদ প্রতিষ্ঠা কোন বিলাসিতা নয় বরং প্রয়োজনের তাগিদ; অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। সঙ্গত কারণেই এদেশে আমরা যেমন সুলতানী, মোঘল ও নবাবী আমলের মসজিদ দেখতে পাই, তেমনি আসহাবে রাসুল (সা.) সময়কালের মসজিদের সন্ধান পাওয়া গেছে আমাদের দেশেই। এ কাজে প্রয়োজনীয় অর্থ ও রসদ সরবরাহ করে থাকেন সংশ্লিষ্ট জনপদের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। মসজিদ নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য সরকারও অনুদান দিয়ে থাকে। এমনকি বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রের দাতা সংস্থাও আমাদের দেশে মসজিদ বানিয়ে দেয়। তাই মসজিদ প্রতিষ্ঠা বা উন্নয়নের জন্য এভাবে পথে পথে সাহায্য প্রার্থনাসহ দেশে একটি ভিক্ষুক পুনর্বাসন প্রকল্প গ্রহণ ও পরিচালনা করা কোনো মসজিদ কর্তৃপক্ষের জন্য সম্মানের ও কাক্সিক্ষত নয়। এতে ইসলাম ও মুসলমানের মর্যাদাও বৃদ্ধি পায় না বরং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের হাসি-ঠাট্টা ও বিনোদনের অনুষঙ্গ হয়ে দেখা দেয়।

ইংরেজপূর্ব ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল মূলত ধর্ম, দর্শন ও বৃত্তিকেন্দ্রিক। এটি আধুনিক শিক্ষার মতো প্রাতিষ্ঠানিক না হলেও, সমাজ ও স্থানীয় শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বেশ সুসংগঠিত ছিল। হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা কেন্দ্র থাকলেও এর মূল লক্ষ্য ছিল নৈতিকতা, ধর্মীয় জ্ঞান এবং ব্যবহারিক দক্ষতা শিক্ষা প্রদান। মুসলমানদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ছিল মক্তব; উচ্চশিক্ষার জন্য ছিল মাদরাসা; যেখানে আরবি, ইসলামি আইন, দর্শন ও জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়ানো হতো। হিন্দু শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষার কেন্দ্র ছিল পাঠশালা। উচ্চশিক্ষার জন্য ছিল টোল বা চতুষ্পাঠী, যেখানে সংস্কৃত ভাষার মাধ্যমে ব্যাকরণ, সাহিত্য, বেদ, জ্যোতিষশাস্ত্র এবং আয়ুর্বেদ শেখানো হতো। প্রাচীন ভারতে শিক্ষার জন্য গুরুকুল পদ্ধতি চালু ছিল। গুরুগৃহে শিক্ষার্থীরা গুরুর আশ্রমে থেকে কঠোর নিয়মের মধ্যে শিক্ষালাভ করতো। এছাড়া বৌদ্ধবিহারগুলো ছিল উচ্চশিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। স্থানীয় রাজা, জমিদার ও সমাজের বিত্তবানদের দানে এসব প্রতিষ্ঠান চলতো। এক্ষেত্রে কোনোভাবেই যানবাহন বা পথে পথে ভিক্ষার প্রয়োজন হয়নি। সে সময় শিক্ষকরা সমাজে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। ১৮৩৫ সালে লর্ড মেকলের শিক্ষানীতি চালুর আগে পর্যন্ত এ দেশজ ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থাই ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল।

ইংরেজপূর্ব ভারতে শিক্ষার মূল খরচ চলতো মূলত রাজা, জমিদার ও বিত্তবানদের আর্থিক অনুদান, করমুক্ত বা লা-খারাজ ভূমিদান (জায়গির) এবং স্থানীয় জনসাধারণের সম্মিলিত সাহায্যে। শিক্ষার এ ঐতিহ্যবাহী দেশীয় ব্যবস্থায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের থেকে কোনো নির্দিষ্ট মাসিক ফি নেয়া হতো না এবং কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছিল না। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী এ ব্যবস্থাটি পরিচালিত হতো সম্রাট ও রাজারা শিক্ষা প্রসারের জন্য মসজিদ-মাদরাসা, মন্দির, মঠ ও টোলগুলোকে বিপুল পরিমাণ করমুক্ত জমি বা ‘জায়গির’ প্রদান করতেন। শিখ সাম্রাজ্যের শাসক রনজিৎ সিং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিক্ষকদের এ ধরনের ভূমি অনুদান দিয়েছিলেন, যা থেকে শিক্ষকদের এবং বিদ্যালয়ের যাবতীয় খরচ চালানো যেতো। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা নিজ দায়িত্বে বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান করতেন এবং কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের থাকা ও খাওয়ার খরচও নিজ দায়িত্বে বহন করতেন। স্থানীয় পঞ্চায়েত, গ্রামের ধনী ব্যবসায়ী ও জমিদাররা গুরুগৃহ বা পাঠশালা নির্মাণের খরচ ও শিক্ষকদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতেন। এছাড়া শিক্ষাবর্ষের বিশেষ দিন বা ফসল কাটার মৌসুমে স্থানীয় কৃষক ও জনসাধারণ শিক্ষকদের নগদ অর্থ, খাদ্যশস্য বা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি উপহার হিসেবে দিয়ে সহযোগিতা করতেন। শিক্ষার্থীরা আনুষ্ঠানিক কোনো ফি দিত না, তবে শিক্ষা সমাপ্তির পর সাধ্যমতো ‘গুরুদক্ষিণা’ হিসেবে অর্থ বা বস্তু প্রদান করতো। এটি বাধ্যতামূলক ছিল না বরং ছিলো শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন।

ব্রিটিশপূর্ব ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী শিক্ষা মূলত মক্তব ও মাদরাসাকেন্দ্রিক একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হতো। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি গণিত, দর্শন, বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিদ্যাও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুলতানি ও মুঘল আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এ ব্যবস্থা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়। ব্রিটিশপূর্ব ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থায় সাধারণত প্রতিটি মসজিদ ও মহল্লায় মক্তব থাকতো। এখানে শিশুদের কুরআন তিলাওয়াত, প্রাথমিক আরবি-ফার্সি এবং গণিত শেখানো হতো। বড় শহর ও রাজধানীগুলোতে উচ্চশিক্ষার জন্য মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে তাফসির, হাদিস, ফিকহ তথা আইনশাস্ত্র, দর্শন এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়ানো হতো। দিল্লির ‘মাদরাসা-ই-ফিরোজশাহী’, ‘মাদরাসা-ই-রহিমিয়া’ এবং বাংলার ‘মাদরাসা-ই-আলিয়া’ উল্লেখযোগ্য। সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতকের দিকে মোল্লা নিজামুদ্দিন কর্তৃক প্রণীত ‘দারসে নিজামি’ সিলেবাস উপমহাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো। বাদশাহ, নবাব ও অভিজাত ব্যক্তিরা মাদরাসার ব্যয় নির্বাহের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি বা সম্পত্তি ‘ওয়াকফ’ বা দান করতেন। ছাত্রদের জন্য শিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈতনিক ছিল। থাকা-খাওয়া ও পড়াশোনার যাবতীয় খরচ প্রতিষ্ঠান বা সমাজের দানশীল ব্যক্তিরা বহন করতেন। তৎকালীন বিচারক (কাজি), মুফতি, রাজস্ব কর্মকর্তা এবং কূটনীতিক নিয়োগের মূলভিত্তি ছিল ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা। এ শিক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল শুধুমাত্র ধর্মীয় জ্ঞান প্রদান নয় বরং সৎ, দক্ষ ও নৈতিক চরিত্রবান নাগরিক তৈরি করা। পরবর্তীতে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসনভার গ্রহণের পর ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করে, যার ফলে দেশজ ও ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন দানবীর হাজী মুহাম্মদ মুহসীন। ১৮০৬ সালে তিনি শিক্ষা বিস্তারে পুরো সম্পত্তির ওয়াকফ বা দানপত্র করে দেন। সেখানে এ সম্পত্তির আয় কীভাবে বিলি বণ্টন করা হবে, তার বিস্তারিত নির্দেশনা দেয়া হয়। সেখানে বলা হয়, শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় স্থাপনা, জনকল্যাণে ব্যয় করা হবে এসব অর্থ। ১৮৩৫ সালে এ তহবিল দিয়ে ‘মহসিন এডুকেশনাল এনডাউমেন্ট ফান্ড’ তৈরি করে ব্রিটিশ সরকার। হাজী মোহাম্মদ মুহসীন যেভাবে দানপত্র লিখেছিলেন, তাতে কিছু পরিবর্তন এনে ব্রিটিশরা দু’টি আলাদা তহবিল গঠন করে। তার একটিতে হাজী মহসিনের ইচ্ছা অনুযায়ী ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে ব্যয় যেমন ইমামবাড়ীর খরচ, পেনশন প্রদান ও মোতোয়ালির বেতন ইত্যাদি খাতে ব্যয় হবে। আরেকটি ফান্ড থেকে শিক্ষার পেছনে ব্যয় হবে। পরবর্তীতে এ তহবিল থেকে ১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় হুগলি মহসীন কলেজ। এরপরে হুগলি কলেজিয়েট স্কুল, হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুল, হুগলি মাদরাসা, সিতাপুর মাদরাসা, ঢাকা চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায় বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। নবাব আব্দুল লতিফ, খাজা আব্দুল গনি, তাদের চেষ্টায় ১৮৭৩ সালে এ ফান্ড থেকে স্কলারশিপ চালু করা হয়। শুধু তাই নয় বরং, তখনকার স্কুলগুলোয় একজন আরবি শিক্ষকসহ বিশেষ করে মুসলিম ছাত্রদের শিক্ষার ব্যাপারে এ ফান্ড থেকে সহযোগিতা আসতো।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও পরে ব্রিটিশ সরকার ভারতবাসীর শিক্ষার মানোন্নয়নের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেননি। তাঁদের শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল প্রতীকি পারিশ্রমিকে ইংরেজি শিক্ষিত কেরানির দল তৈরি করা। ১৭৮১ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতা মাদরাসা (অধুনা আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়) চালু করেন। ১৭৯১ সালে জোনাথান ডানকান বারাণসীতে একটি সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮০০ সালে লর্ড ওয়েলেসলি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের দেশীয় ভাষা ও আদবকায়দা শেখানোর উদ্দেশ্য নিয়ে কলকাতায় চালু করেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ।

১৮৩৫ সালে ইংরেজি ভাষাকে ভারতের উচ্চশিক্ষার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৮৫৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘উড’স ডেসপ্যাচ অন এডুকেশন’। চার্লস উডের এ ‘ডেসপ্যাচ’কেই ব্রিটিশ ভারতে শিক্ষার ম্যাগনা কার্টা আখ্যা দেওয়া হয়। তিনিই প্রথম প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চস্তর পর্যন্ত শিক্ষার একটি যুক্তিসঙ্গত পাঠক্রম নথি আকারে প্রকাশ করেন। এ নথিতে প্রাথমিক স্তরে, মাধ্যমিক স্তরে এবং উচ্চশিক্ষা স্তরে কিভাবে কি পড়ানো হয়ে তার বিভাগ করে দেন তিনি। উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসাবে ইংরেজি এবং প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে স্থানীয় ভাষাকে গ্রহণ করা হয়। দেশীয় ভাষা শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইঙ্গ-দেশীয় ভাষা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও অনুমোদিত কলেজগুলি প্রতিষ্ঠিত হয়। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি সরকারি অনুদান পেতে শুরু করে। নারীশিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে ঘরোয়া পরিবেশে মেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। শিক্ষক-প্রশিক্ষণের জন্যও উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। কারিগরি শিক্ষার গুরুত্বও স্বীকৃতি পায়। ১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বাই ও মাদরাজ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়।

ব্রিটিশ-পূর্ব ভারতীয় উপমহাদেশে মসজিদ ব্যবস্থাপনা মূলত পরিচালিত হতো ওয়াকফ ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে। সুলতানি ও মুঘল আমলে মুসলিম শাসকরা মসজিদ নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং এর পরিচালনার জন্য বিশাল এলাকা বা সম্পত্তি ‘ওয়াকফ’ করতেন। মূলত, মসজিদ পরিচালনার মূল আর্থিক জোগান আসত ওয়াকফকৃত কৃষি জমি, দোকান বা বাণিজ্যিক ভবন থেকে। এ সম্পত্তির আয়ে মসজিদের যাবতীয় খরচ মেটানো হতো। ওয়াকফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়খ বা ‘মুতওয়াল্লি’ মসজিদের প্রশাসনিক ও আর্থিক দিক দেখাশোনা করতেন। ধর্মীয় কাজের জন্য ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং খতিব নিয়োগ দেয়া হতো। সুলতান, নবাব ও অভিজাতরা রাজকোষ থেকে বা ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বড় বড় জামে মসজিদ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে আর্থিক অনুদান দিতেন। তৎকালীন বিচার বিভাগ বা ‘কাজীর’ দপ্তর ওয়াকফ সম্পত্তির সঠিক ব্যবহার এবং মুতওয়াল্লিদের কার্যক্রম তদারকি করত। সে সময় মসজিদ কেবল ইবাদতের স্থানই ছিল না, বরং দাতব্য কার্যক্রম যেমন, লঙ্গরখানা, বিচারালয় ও শিক্ষার কেন্দ্র (মক্তব/মাদরাসা) হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। স্থানীয় সমাজই মসজিদের দৈনন্দিন তদারকিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করত।

ব্রিটিশ আমলেও মসজিদ ব্যবস্থাপনা মূলত পরিচালিত হতো ওয়াকফ (ডধয়ভ) সম্পত্তি, স্থানীয় সমাজভিত্তিক কমিটি এবং মুসলিম জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে। সরকার সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য আইন প্রণয়ন ও তদারকি করত। অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও প্রাচীন মসজিদগুলো পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত জমি বা সম্পত্তি ওয়াকফ তথা স্থায়ী দান করা থাকত। একজন মোতাওয়াল্লি (প্রশাসক বা ট্রাস্টি) ব্যক্তিগত বা বংশানুক্রমিকভাবে এসব সম্পত্তির আয় থেকে মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ, ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন ও মুসল্লিদের খাবার খরচ বহন করতেন। উপমহাদেশে মুসলিম দাতব্য সম্পত্তি বেহাত হওয়া রোধ করতে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৪ সালে প্রথম বেঙ্গল ওয়াকফ অ্যাক্ট পাস করে। এ আইনের মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তির নিবন্ধন এবং অপব্যবহার রোধে একটি প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। ছোট ও মাঝারি মসজিদগুলো সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় মুসল্লিদের গঠিত কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হতো। অপরদিকে বড় বড় মসজিদগুলোÑযেমন ঢাকার নবাব পরিবারের মত প্রভাবশালী জমিদার এস্টেট নিজস্ব তত্ত্বাবধানে পরিচালনা ও সংস্কার করত। ব্রিটিশরা ‘ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন অ্যাক্ট’ (Land Acquisition Act) এর মতো সাধারণ আইনের মাধ্যমে পাবলিক ওয়েলফেয়ার বা রাস্তাঘাটের প্রয়োজন বিভিন্ন এলাকার সম্পত্তি অধিগ্রহণ করত। এছাড়া সরাসরি মসজিদ পরিচালনায় সরকারের কোনো প্রশাসনিক কমিটি বা হস্তক্ষেপ ছিল না। ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ আইন প্রণেতারা ওয়াকফ সম্পত্তিগুলো যেন মুসলিমদের হাত থেকে অন্য কারও নিয়ন্ত্রণে চলে না যায়, সে বিষয়ে প্রথম উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরে কঠোর নিবন্ধন আইন চালু করা হয়।

ফলে একথা স্পষ্টতই প্রমাণ হয় যে, ধর্মীয় শিক্ষা, মসজিদ-উপাসনালয় কখনো ভিক্ষানির্ভর ছিলো না বরং সরকার বা শাসকগোষ্ঠী, জমিদার, সমাজের বিত্তশালী ও ধর্মপ্রাণ মানুষই ছিলেন এসবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। এজন্য কারো কাছে হাত পাতার প্রয়োজন হয়নি বরং সংশ্লিষ্টরা ধর্ম ও মানুষের কল্যাণে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এসব ফান্ডে মুক্তহস্তে দান করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিষয়টিকে এখন রীতিমত ভিক্ষাবৃত্তির পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। যা কোনোভাবেই সম্মানজনক ও কাক্সিক্ষত নয়। তাই এ অশুভ বৃত্ত থেকে আমাদেরকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে।

www.syedmasud.com