মাহবুবুল হক
পাশের দেশে ‘গো-হত্যা’ নিষ্ঠুরভাবে বন্ধ করা হয়েছে। সেসব নিয়ে সেখানে তুলকালাম কাণ্ড হচ্ছে। সেই কাণ্ড-কারখানার কিছু আঁচতো আমাদের গায়ে লাগবেই। তবে আমরা বরাবরের মতো শান্তভাবে সবকিছু বিবেচনা করবো। এসব ফালতু জিনিস নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ করার সময় আমাদের নেই। ওরাতো আসলে গায়েপড়ে ঝগড়া বাধাতে চাচ্ছে, এই বিষয়টি আমাদের খুব ভালভাবে উপলব্ধি করতে হবে। আমাদের দেশে তো ওদের দালালদের কমতি নেই। যতই দিন যাচ্ছে ততই দালালে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশ। সে বিষয়েও আমাদেরকে দারুণভাবে সতর্ক ও সাবধান থাকতে হচ্ছে।
আমাদের বিবেচনায় গোটা রাজনীতি এখন একেবারেই ওলট-পালট করে দিতে হবে। কেনো তথাকথিত বন্ধুর কথা শোনার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের চারপাশে এখন শত্রু। আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠতম রাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক এইতো সেদিন বলেছেন-মানুষের বন্ধু হয়, রাষ্ট্রের কোনো বন্ধু হয় না। এখনকার জন্য এটাই স্বতঃসিদ্ধ কথা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যদি ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্ব বলে কোনো কথা থাকতো, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কানাডাকে দখল করার কথা বলে কেন? পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম রাজ্যের নবতর মুখ্যমন্ত্রী বাংলাদেশকে দখল করার কথা বলে কেন। বাংলাদেশ পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের কি ক্ষতি করেছে। ক্ষতি যদি হয়েই থাকে সেটাতো হয়েছে তাদেরই জন্য।
’৭১ সালে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়। তখন আমরাসহ সারাবিশ্বের মানুষ তাদের বদান্যতা দেখে উল্লাস প্রকাশ করেছি। কিন্তু পরবর্তীতে যোগ-বিয়োগ করে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, তারা তাদের নিজের স্বার্থেই সহায়তা বা সহযোগিতা করেছেন। সে কথা শোনার আগেই ২৪’শের পতিত সরকারের প্রধান দিলখুলে, প্রাণখুলে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছেন বন্ধুরাষ্ট্র ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছে আমরা তার বিনিময়ে সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি। আমাদের কোনো ঋণ বাকী নেই। আমরা যা দিয়েছি চিরকাল তা’ তারা মনে রাখবে।
এই ধরনের কষ্ট-কঠোর কথা তিনি যে, মাঝে মাঝে বলেন নি, তা নয়। কিন্তু এর মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো। ভারতপন্থীরা বলেছেন, এই কথা বলায় আমরা খাটো হয়েছি। ভারতের কাছে ছোট হয়েছি। ব্যক্তি হোক, সমাজ হোক, কি দেশ হোক এই ধরনের খোঁটা দেয়া সভ্যতা, ঐতিহ্য, ও সংস্কৃতির বাইরের জিনিস। কোনো সভ্য মানুষ বা ভদ্রলোক ভুলেও এমন কথা বলেন না। সমমর্মিতা, সমবেদনা, সাহায্য, সহানুভূতি বলতে গেলে একতরফাই থাকে। কোনো সভ্য মানুষ, সভ্য সমাজ বা সভ্য দেশ এর বিনিময় চাইতে পারেন না বা চান না।
বিশ্বে বিরাজমান রাখবে, সেই নবতর ভঙ্গুর স্বপ্নেও বিভোর ছিলো।
অন্যদিকে ‘সোহরাওয়ার্দীর’ বেঈমানির কারণে ‘জিন্নাহ ও শেরেবাংলার’ ‘স্টেট্স-এর দাবি নস্যাৎ হয়ে ‘ওয়ান স্টেট’ ‘অর্থাৎ মুসলিমদের জন্য একটি মাত্র দেশ প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেখে ভারতের মুসলমানরা অনেকটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। জিন্নাহ’র কথা বোঝার মতো ক্ষমতা বা অবস্থা তাদের ছিল না।
বর্তমান প্রজন্ম মনে করতে পারে, ভারত এখন যা’ করছে, তা’ সাময়িক বিষয়। নির্বাচনের আগে-পরে এই উপমহাদেশে এ ধরনের হয়েই থাকে। অল্পদিনে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের মতো যাদের বয়স ৮০ ধর ধর, তাঁরা পাগল হলেও ঘুমের ঘোরেও এমনতর কথা বলবে না। কারণ, শিক্ষিত হোক, অশিক্ষিত হোক, স্বল্প শিক্ষিত হোক, তারা ভালোভাবে জানে, দেশ ভাগের সময় রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক বড় বড় রাজনৈতিক নেতা বলেছেন বা উপদেশ-পরামর্শ দিয়েছিলেন -ভাগটা হতে দাও, এখন চুপচাপ থাকো, পূর্ব বাংলাকে দখল করতে আমাদের সময় লাগবে না। পূর্ব বাংলার হিন্দু-মুসলমানের সাথে আমাদের সখ্য আছে। সময় ও সুযোগ মতো সেটা আমরা অবশ্যই করতে পারবো।
সেই পূর্ব বাংলা স্বাধীন দেশ হয়েছে, ৫৫ বছর হলো, এখনও তারা একই সুরে একই কথা বলছে। একজন সাধারণ মানুষ বুঝে না বুঝে নানা ধরনের কথা বলতে পারে। তার দায়িত্বের সীমা অনেক বড় নয়। তার দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহিতা সীমাবদ্ধ। সীমাহীন নয়। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর একটি রাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীরা যখন প্রতিবেশী একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রকে দখল করতে চান বা ঘোষণা দেন, তখন সে বিষয়টিকে পাগল বা ছাগলের প্রলাপ বলে হেসে উড়িয়ে দেয়া যায় না।
একটু ভুল বললাম, শুধু এবারের নির্বাচনের পরে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীরা বা তাদের দলের শীর্ষ রাজনীতিবিদগণ এমন ধরনের নিকৃষ্ট জুলুম ও অত্যাচারের কথা বলছেন এমন নয়। দেশভাগ হওয়ার পর থেকেই তারা মুসলমানদের ওপর সব ধরনের জুলুম-অত্যাচার করে আসছে। প্রথমে তাদের ণ্ডমকি-ধামকি ছিলো- ভারত হিন্দুদের। হিন্দুরাই শুধু এখানে বসবাস করবে। অন্যরা এ দেশ থেকে চলে যাবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বহুবার, বহু উপলক্ষে এই ধরনের কথা বলে আসছে। তারা আফগানিস্তান থেকে বার্মা পর্যন্ত অতীতের ভারতবর্ষকে অর্থাৎ মোগল পূর্ব তথাকথিত বিশাল হিন্দুরাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠার নতুন করে শপথ অব্যাহত রেখেছে। এই অবস্থা ও ব্যবস্থায় বাংলাদেশের বর্তমান দুর্বল সরকারের ওপর সকল দায়-দায়িত্ব ফেলে রেখে আমরা নির্ঘুম রজনী অতিবাহিত করতে পারছি না। বাংলাদেশে মাত্র সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো। এখন তাদের ডেসটিনি নিশ্চিত করা হয় নি। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিশ্চিয় করা হয়নি। ২৪-শের লেগাসি এখনও পরিপূর্ণ করা হয় নি। সেই এলোমেলো অবস্থায় সত্যি সত্যি যদি আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়, তাহলে আমাদের সামরিক শক্তি প্রস্তুত থাকলেও জনতার একতা না থাকলে কোনোভাবে আমরা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারবো না। এখন শুধু সাধারণ ঐক্যের কথা বললে হবে না। জাতিগত সর্বাত্মক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বাংলাদেশ গণতন্ত্রের জন্য উজ্জীবিত স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি দেশ এবং ভারত একটি তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশ। সাথে ধর্মনিরপেক্ষতাও সেখানে প্রধান বিষয়। কিন্তু কার্যত গত ৮০ বছরে এসবের চর্চা সেদেশে কখনও পরিলক্ষিত হয়নি। গণতন্ত্রের নামে, স্বাধীনতার নামে, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে, অসাম্প্রদায়িকতার নামে তারা সবসময় সাম্প্রদায়িকতাকে বিপুলভাবে চর্চা করে আসছে। তাদের তথাকথিত সংবিধান কখনও সঠিকভাবে উদ্ভাসিত হয়নি। সবকিছুই চলে আসছে তথাকথিত আনুষ্ঠানিকতার ছায়ায়। ব্রিটিশদের মতো তারাও ভেতর ও বাইরে দু’রকম মানুষ। যে সরকারই হোক সরকারগুলো ছিলো সবসময় দু’মুখী। যা বলতো তা করতো না। যা করতো তা বলতো না । পূর্বে তারা পশ্চিম পাকিস্তানকে পানি দিত কিন্তু পূর্বপাকিস্তানে কখনই পানি বণ্টন সঠিকভাবে করতো না। কিন্তু এখন পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যাপারেও একই অবস্থা তারা গ্রহণ করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের ওপর বা বাংলাদেশের ওপর যুদ্ধ না চাপালেও সবসময় অবারিতভাবে বর্ডারে পূর্ব পাকিস্তানি বা বাংলাদেশীদের অকারণে বা অহেতুক হত্যা করতো।
এখানকার সরকারের পরিবর্তনের কারণে কখনও বর্ডার হত্যা বন্ধ হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তান বা পাকিস্তানের ওপর যতবার তারা যুদ্ধ চাপিয়েছে ততবারই তারা পরাজয় বরণ করেছে। কিন্তু সেখানকার বর্ডারে বর্ডারে ছোট থেকে বড় সবসময় যুদ্ধ বাধিয়ে রেখেছে। দেশের অভ্যন্তরে রাজ্যে রাজ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে রেখেছে । মানবাধিকারের সংগা একেক রাজ্যে একেক রকম। হিন্দু ধর্মের আকৃতি, প্রকৃতি, আবেদন ও উপস্থাপন একেক রাজ্যে একেক রকম। অর্থাৎ নানারকম। জনগণকে বা বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের বিষয়ে আইন যাই থাকুক না কেন হিন্দুত্বের চানক্য রাজনীতি প্রবলভাবে রাজ্যে রাজ্যে বিরাজমান।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনোদন ও সংস্কৃতি একরকমের হলেও তাদের মূল সম্পর্ক ইসরাইলের সাথে। এখন নানাদেশেই গবেষণা চলছে সত্যিকার অর্থে আরএসএস কাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। বিচ্ছিন্নভাবে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে ভারতের আরএসএসও - ভারত, ব্রিটিশ ও ইসরাইলের সম্মিলিত উদ্যোগেই এই ধরনের একটি জঙ্গি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। গত ৩ শত বছরে নানামাত্রিক কার্যকারণ বিভিন্নভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এই তিন দেশের সূত্র, এক সূতায় গাঁথা। ব্রিটিশদের সাথে ভারতবর্ষের কখনও কোনো দ্বিমত বা সাংঘর্ষিক উপসর্গের সৃষ্টি হয়নি। যেমন হয়নি ইসরাইলের সাথে। গত ১০০ বছরের গবেষণায় দেখা গেছে ব্রিটিশরা মুসলিম বিশ্বের বোধ-বিশ্বাস, চিন্তা ও চেতনাকে এলোমেলো করে দেয়ার জন্য প্রায় ৭ হাজার ইহুদী আলেম সৃষ্টি করেছিলো। এখন তার সংখ্যা কত কে জানে। আসলে এরা ইহুদী আলেম নয়, বাস্তবে জায়নিস্ট আলেম।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে আরবী জানা ইহুদীদেরকে বিপুল ব্যয় সাপেক্ষে মুসলিম ভণ্ড আলেমে পরিণত করা হয়েছে। তারা এই কুরআনকে বন্ধ করে রেখে মধ্যপ্রাচ্যসহ সারাবিশ্বে নানারকম হাদিস, ইজমা, কিয়াস, ফতোয়া সঞ্চালিত করেছে। মুসলিম বিশ্বে এই যে, নানারকম মাজহাব দেখা যাচ্ছে তার অধিকাংশের সৃষ্টির মূলে রয়েছে, জায়নবাদ। ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশে ব্রিটিশরা গোপনে মাদরাসা সৃষ্টি করে (কোথাও কোথাও মাটির নিচে)।
কোথাও গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৈরী করে। নানাদেশে নানাদল তৈরী করে এক সময় যে কাজ শুরু করেছিলো যেমন, ভারতবর্ষে তারা তৈরী করেছিল, কাদিয়ানি, বাহাই, আগাখানি, ইসমাইলিয়া, শিয়া, নানারকম সুন্নী, নানারকম হাদিস মাজহাব, নানারকম কেতাব মাজহাব, মাজার পূজারী, পীর পূজারী, এমন কি এও বলা হয়ে থাকে যে তবলীগ জামাতও এদের ষড়যন্ত্রের ফসল। ব্রিটিশরা মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলীর খেলাফত আন্দোলনও নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করেছিলো। একসময়ের যে ফ্রি-মেশন আন্দোলন তাতেও তো একসাথে কাজ করেছিলো হিন্দু, মুসলমান, ইহুদী ও খ্রীস্টান। কমিউনিজম, গণতন্ত্র, ফ্যাসিজম, জাতীয়তাবাদ, আঞ্চলিকতাবাদ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে দুনিয়াকে রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি, সভ্যতা, চিন্তা-চেতনা,দর্শন, বিজ্ঞানসহ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ এখন পর্যন্ত করে আসছে এই জায়নগোষ্ঠী বা জায়ানিজম।
এখন যে ডিপস্টেট বলা হচ্ছে সেটাও এর কর্পোরেট গ্রুপ। এদের হাতেই তাবদ দুনিয়ার নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব, যুদ্ধ, ধ্বংস সবকিছু। এই পরিস্থিতিতে শুধু সরকারিদল ও বিরোধীদল তৈরী করে তথাকথিত গণতন্ত্র নিয়ে ভবিষ্যৎ রচনা করা যাবে না। প্রত্যেকের সমস্যা আলাদা। আমাদের সমস্যা আলাদা। আমাদের সমস্যার সমাধান আমাদেরই হাতে। আমাদেরই চিন্তা-চেতনার মূলসূত্রে। এখন প্রয়োজনে সর্বদলীয় জাতীয় সরকার বা কোয়ালিশন সরকার গঠন করে হলেও দেশ, জাতি, রাষ্ট্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতিসত্ত্বাকে রক্ষা করতে হবে।