সুরাইয়া বিনতে হাসান

স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম পূর্বশর্ত হলো নাগরিকদের জন্য মানসম্মত ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। একজন মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন তার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে দ্রুত, সঠিক এবং সাশ্রয়ী চিকিৎসা পাওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশের অসংখ্য সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে গিয়ে নানাবিধ ভোগান্তির শিকার হন। হাসপাতালের দীর্ঘ সারি, চিকিৎসকের সংকট, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার জটিলতা এবং স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যসেবা আজ অনেক সাধারণ মানুষের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

বর্তমান যুগে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং নতুন নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির কারণে অনেক জটিল রোগের চিকিৎসা এখন সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু এই অগ্রগতির সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষ সমানভাবে পাচ্ছেন না। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে নানা বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। ফলে স্বাস্থ্যসেবা একটি মৌলিক অধিকার হওয়া সত্ত্বেও অনেকের কাছে তা যেন এক প্রকার বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।

সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের অন্যতম প্রধান কারণ হলো সরকারি হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ। প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসেন, কিন্তু সেই তুলনায় চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা যথেষ্ট নয়। ফলে একজন চিকিৎসককে অল্প সময়ের মধ্যে অনেক রোগী দেখতে হয়। রোগীরা প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ পান না। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ মেলে। এতে অনেক রোগী মনে করেন যে তাদের সমস্যাটি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।

হাসপাতালের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও একটি বড় সমস্যা। অনেক সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা নেই। ফলে রোগীদের মেঝেতে বা করিডোরে অবস্থান করতে হয়। জরুরি বিভাগগুলোতে রোগীর চাপ এত বেশি থাকে যে অনেক সময় দ্রুত সেবা প্রদান করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে দুর্ঘটনা, হৃদরোগ বা অন্যান্য জরুরি অবস্থায় এই বিলম্ব রোগীর জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা সংক্রান্ত জটিলতাও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়। রোগ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করানো প্রয়োজন হলেও অনেক হাসপাতালের পরীক্ষার যন্ত্রপাতি অপ্রতুল বা অকার্যকর থাকে। ফলে রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হয়। সেখানে পরীক্ষার খরচ অনেক বেশি হওয়ায় অনেক পরিবার আর্থিক চাপে পড়ে। কখনও কখনও চিকিৎসার চেয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয়ই বেশি হয়ে যায়। ফলে অনেক মানুষ অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে পারেন না এবং রোগ জটিল আকার ধারণ করে।

চিকিৎসা ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বগতি বর্তমানে অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয়। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসা নিতে গেলে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। চিকিৎসকের ফি, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খরচ মিলিয়ে একটি সাধারণ পরিবারের পক্ষে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

অনেক পরিবার চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে ঋণ গ্রহণ করে, সঞ্চয় ভেঙে ফেলে কিংবা সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয়। একটি অসুস্থতা কখনও কখনও পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।

গ্রাম ও শহরের স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্যও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। শহরাঞ্চলে তুলনামূলকভাবে উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়া গেলেও গ্রামীণ এলাকায় সেই সুযোগ অনেক সীমিত। অনেক গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই, পর্যাপ্ত ওষুধ নেই, এমনকি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামও নেই। ফলে গ্রামীণ জনগণকে চিকিৎসার জন্য জেলা বা বিভাগীয় শহরে ছুটতে হয়। এতে সময় ও অর্থ উভয়েরই অপচয় হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে এই দূরত্ব কখনও কখনও প্রাণহানির কারণও হয়ে দাঁড়ায়।

সচেতনতার অভাবও স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। অনেক মানুষ রোগের প্রাথমিক লক্ষণকে গুরুত্ব দেন না এবং সময়মতো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না। আবার কেউ কেউ হাতুড়ে চিকিৎসক বা অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে প্রচারিত ভুল তথ্যের কারণে অনেক মানুষ বিভ্রান্ত হন। ফলে রোগ আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং পরে সঠিক চিকিৎসা পেতে বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়।

রোগীদের সঙ্গে মানবিক আচরণের অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। একজন অসুস্থ ব্যক্তি শুধু চিকিৎসাই চান না, তিনি সহানুভূতি এবং সম্মানও প্রত্যাশা করেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে রোগী ও তার স্বজনরা যথাযথ তথ্য পান না বা অবহেলার শিকার হন। এতে তাদের মানসিক কষ্ট বৃদ্ধি পায়। চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যায়। স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের জন্য মানবিক আচরণ এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

স্বাস্থ্যসেবায় দুর্নীতি এবং অনিয়মের অভিযোগও মাঝে মাঝে শোনা যায়। কোথাও কোথাও দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, ওষুধের কৃত্রিম সংকট কিংবা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়ে দেয়। এসব অনিয়ম স্বাস্থ্য খাতের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে এবং স্বাস্থ্যসেবাকে আরও ব্যয়বহুল করে তোলে।

তবে এ সমস্যার জন্য কেবল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বা চিকিৎসকদের দোষারোপ করলেই সমাধান হবে না। জনসংখ্যার তুলনায় স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ এখনও পর্যাপ্ত নয়। স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জনগণের স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্ব আরোপ করাও জরুরি।

স্বাস্থ্যসেবায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, গ্রামীণ এলাকায় মানসম্মত চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ, চিকিৎসা ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সম্মান বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, একটি সভ্য ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তার নাগরিকদের জন্য কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্যসেবায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ শুধু ব্যক্তিগত কষ্টের বিষয় নয়, এটি একটি জাতীয় সমস্যা। একজন মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য অসহায়ভাবে ঘুরে বেড়ান, তখন তা রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই সামনে নিয়ে আসে। তাই স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানবিক করে তোলা আজ সময়ের দাবি। সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে শুধু মানুষের কষ্টই কমবে না, বরং একটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও উন্নত জাতি গঠনের পথও আরও সুগম হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।