জসিম উদ্দিন মনছুরি
গণঅভ্যুত্থানের প্রামানিক দলিল জুলাই সনদ। জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি ছিল সংবিধান সংস্কার ও বাস্তবায়ন। দীর্ঘদিন স্বৈরাচারী সরকারের নিষ্ঠুর শাসনের জাঁতাকলে পৃষ্ঠ হয়ে জনগণ দাবি আদায়ের লক্ষ্যে অভ্যুত্থানের ডাক দেয়। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১৪০০ জন শাহাদাত বরণ করেন। অসংখ্য জুলাই যোদ্ধা হতাহত হন। জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল সংবিধান থেকে শুরু করে রাষ্ট্র সংস্কার। জুলাই অভ্যুত্থানের স্বপক্ষের শক্তিসমূহ দীর্ঘদিন আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে জুলাই সনদ সাক্ষরিত হয়। ১৭ অক্টোবর ২০২৫, ২৬টি রাজনৈতিক দলের ঐক্যমতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় মহান জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয়। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ (July National Charter)) রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কারের ৮০টিরও বেশি প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সনদের উল্লেখযোগ্য ধারা ও প্রস্তাবগুলো হল : প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, প্রধানমন্ত্রী পদে ১০ বছর বা সর্বোচ্চ দুই মেয়াদের বাধ্যবাধকতা। পদ পৃথকীকরণ: একই ব্যক্তির একাধারে প্রধানমন্ত্রী ও দলের প্রধান হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা। বিচার বিভাগ: প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচারক নিয়োগ কমিশন গঠন। ক্ষমতার ভারসাম্য: সংসদ ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনয়ন এবং মৌলিক অধিকারের সম্প্রসারণ। নারীর প্রতিনিধিত্ব: আইনসভায় নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি।
জুলাই সনদে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে জুলাইয়ের স্বপক্ষের রাজনৈতিক দলসমূহ জুলাই সনদের বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল দলের প্রতিশ্রুতি ছিল নির্বাচিত হলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবেন। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুইটি ব্যালটে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একটি ছিল সংসদ সদস্য নির্বাচনের ভোট। অন্যটি ছিল জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ভোট।
নির্বাচনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে ৬৮.৫৯ ভাগ ভোটার ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট দেন। গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হওয়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হবে এটাই ছিল জনগণের প্রত্যাশা। কিন্তু বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে। কথা ছিল সংসদের প্রথম অধিবেশনে দুইটি শপথ অনুষ্ঠিত হবে। একটি হবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পরিষদ সদস্যের শপথ। অন্যটি হবে সংসদ সদস্যের শপথ। বিরোধী দল দুইটি বিষয়ের উপর শপথ গ্রহণ করলেও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পরিষদ সদস্যের শপথ না নিয়ে শুধুমাত্র সংসদ সদস্যের শপথ গ্রহণ করেন। সরকারি দল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পরিষদের শপথ না নেওয়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে দেখা দেয় অনিশ্চয়তা।
এর মাঝে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে কঠোর অবস্থান নেন। তারা বিভাগীয় শহরে সমাবেশে জুলাই সনদের বাস্তবায়নের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেন। বিরোধীদল সরকারকে সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে বিভিন্নভাবে বলা সত্ত্বেও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে সরকার সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করে প্রস্তাব পাস করেন। প্রতিবাদে বিরোধীদল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। ১৩ জুলাই সংসদ অধিবেশনে চিফ হুইপ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটির নাম সংসদে উপস্থাপন করেন। পরে তা কণ্ঠ ভোটে পাস হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধনে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করে জাতীয় সংসদ। ১৭ সদস্যের কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিরোধী দল নাম না দেওয়ায় ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। ৫ জনের নাম দেওয়ার জন্য বিরোধী দলকে অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু বিরোধী দল কারও নাম দেয়নি। তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করার দাবিতে অনড় আছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন, শাকিলা ফারজানা, মাহমুদুল হক রুবেল, গণসংহতি আন্দোলনের সংসদ সদস্য জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, বিজেপির সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের সংসদ সদস্য নুরুল হক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদ সদস্য মো. অলি উল্লাহ।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের সংবিধান এ পর্যন্ত মোট ১৭ বার সংশোধন করা হয়েছে। সর্বশেষ সপ্তদশ সংশোধনীটি ২০১৮ সালে পাস হয়। সম্প্রতি বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী কিছু অংশ বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট।
পঞ্চদশ সংশোধনীর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য:
১৯৭২ সালের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার চারটি মূল মৌলিক রাষ্ট্রীয় নীতি পুনর্বহাল করা হয়। সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংখ্যা বর্তমান ৪৫ থেকে ৫০টিতে উন্নীত করা হয়। অনুচ্ছেদ ৭-এর মধ্যে সংবিধান বহির্ভূত উপায়ে ক্ষমতা দখল শেষ করার জন্য ৭(ক) এবং ৭(খ) অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত করা হয়। ধারা ৭(খ) অনুযায়ী, সংবিধানের মৌলিক বিধানগুলিকে “অসংশোধনযোগ্য” ঘোষণা কর। অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলকারীদের রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে অভিযুক্ত করার এবং শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ দণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয় যা ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক বাতিল করা হয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান। সংবিধান থেকে গণভোট ব্যবস্থা বাতিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্তদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়। জরুরি অবস্থা ১২০ দিনের বেশি চলতে পারে না।
সংবিধানের শেষে তিনটি নতুন তফসিল সন্নিবেশিত করা হয় যা হলো শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ, ২৫ মার্চ ১৯৭১ মধ্যরাতে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকার কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা। ২০১১ সালের ৩০ জুন সংসদে বিলটি পাস হয়।
১৮ আগস্ট ২০২৪ সালে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল চেয়ে রিট করেন। এরপর বেশ কিছুদিন শুনানি শেষে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল করে সর্বশেষ রায় প্রদান করেন ৯ জুলাই ২০২৪। প্রধান বিচারপতি জুবায়দুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।
বিএনপি সরকার যদিও বারবার বলে আসছে তারা জুলাই সনদ শতভাগ বাস্তবায়ন করবেন। তবে কিভাবে বাস্তবায়ন করবেন তার রূপরেখা এখনো প্রদান করেননি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোট জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠন করার জন্য অনড় রয়েছেন। এবার দেখার বিষয় জুলাই সনদ কী আদৌ বাস্তবায়িত হবে? নাকি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন দীর্ঘকাল ধরে ঝুলে থাকবে? সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলের কোন সদস্য না থাকায় সরকারি দল কিভাবে সংবিধান সংশোধন করেন তাও দেখার বিষয়। সংবিধানে কি নতুনত্ব কিছু আসবে? নাকি নিজেদের সুবিধার জন্য সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।
জনগণের প্রত্যাশা ছিল নির্বাচিত দল জুলাই সনদ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতকে সরকারি দল শ্রদ্ধা দেখবে। কিন্তু সরকারি দল তার কিঞ্চিত মাত্র বাস্তবায়ন না করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বারবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। কিন্তু আদৌ তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে কিনা তা নিয়ে জনগণের মধ্যে সংশয় রয়েছে। এখনো সময় রয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠন করা এবং জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন করা। তাহলে গণঅভ্যুত্থানের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। আশা করি সরকারের ভোল ভাঙবে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে সংবিধান সংশোধন করবে। যে সংবিধান হবে জনআকাক্সক্ষার, জনমতের ও জনপ্রত্যাশার।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।