ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে টানা ষষ্ঠ রাতের মতো তীব্র বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতের এই নতুন দফার হামলায় দেশটির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো ও সামরিক স্থাপনা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) পৃথক বিবৃতিতে এই হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
নতুন এই দফার হামলায় সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে হরমোজগান প্রদেশের বন্দর আব্বাস-কাহুরেস্তান-লার সংযোগকারী সড়ক ও বান্দার-ই খামির সেতুতে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া এবং সিজিটিএন ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যম ফার্স নিউজের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, বান্দার-ই খামির সেতুতে মার্কিন বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭ জনে দাঁড়িয়েছে এবং অন্তত ৯ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ এবং তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সি তাদের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে যে, এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে সেতুটি ভেঙে শুর নদীতে ধসে পড়েছে, যা বন্দর আব্বাসের সঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরীণ শহরগুলোর মূল স্থলযোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে এই সুনির্দিষ্ট হামলাগুলো চালানো হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ এবং চালকবিহীন ড্রোন থেকে ছোঁড়া নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রে ইরানের মূল বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসসহ বিভিন্ন স্থানে দেশটির সামরিক কমান্ড সেন্টার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতা এবং উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্রগুলোকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
সেন্টকম আরও উল্লেখ করেছে, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নৌযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের আক্রমণাত্মক অবস্থান দুর্বল করাই তাদের এই সামরিক অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য।
তবে এই অভিযানে কেবল সামরিক অবকাঠামোই নয়, বরং ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবি-এর বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বন্দর আব্বাসের ‘আল্লাহু আকবার’ নামক একটি আবাসিক এলাকায় চালানো বিমান হামলায় সাতজন সাধারণ নাগরিক আহত হয়েছেন এবং শহরের একটি প্রধান টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ধ্বংস হয়ে গেছে। পাশাপাশি ইরানের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য এলাকা যেমন- কেশম দ্বীপ, বুশেহর এবং সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের ইরানশাহর বিমানবন্দরের রানওয়ে ও অপারেশন ভবনেও দফায় দফায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
এই ভয়াবহ হামলার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং নতুন করে সর্বাত্মক যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে পার্শ্ববর্তী দেশ কুয়েতের সামরিক বাহিনী যেকোনো সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা রুখতে তাদের সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালির এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামও দ্রুত গতিতে বাড়তে শুরু করেছে।