ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য দখলদার মালিকের আগে যারা প্রকৃত মালিক ছিলেন তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল। তিনি বলেন, প্রকৃত মালিক বলতে এস আলম জোর করে দখল করার আগে এই ব্যাংকের মালিকানায় যারা ছিল, তাদের কাছে ব্যাংক ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত এখানকার গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসবে না, আসার কোনো সুযোগ নেই।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটে উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি একথা বলেন।
নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, আসলে বাঙালি হিসেবে ঋণ করে ঘি খাওয়ার যে আমাদের প্রবণতা, এখানে আমরা বাজেটে সেটাই লক্ষ্য করছি। বাজেটের লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং পর্যায়ক্রমিক আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন। তৃণমূল তথা প্রান্তিক এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়ন, বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের জীবনমানের উন্নয়নÑএটি লক্ষ্য হওয়া উচিত। একটা মডেল বাজেট আমরা যদি সামনে রাখি, তাহলে বেকারত্ব দূরীকরণ ও ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির বৈশিষ্ট্যতা থাকা উচিত, দারিদ্রতা দূরীকরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অগ্রাধিকার থাকা উচিত, দুর্নীতি ও অপচয় রোধের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা উচিত, ঋণনির্ভরশীলতা পর্যায়ক্রমিক কমানোর পদক্ষেপ এবং সেক্ষেত্রে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। একটি মডেল বাজেটের জন্য আত্মনির্ভরশীলতার লক্ষ্য অর্জনের দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। রাজস্ব খাতের আয় কমপক্ষে ৯০ থেকে ৯০% থেকে ৯৫% অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা থাকা উচিত।
তিনি বলেন, আমরা মূল্যস্ফীতির কথা বলছি। এই মূল্যস্ফীতি আমরা বলছি যে বাজেট পেশ করার পরে জিনিসপত্রের মূল্য বাড়েনি, অত্যন্ত কৌশলগতভাবে সরকার বাজেট পেশ করার ৭ দিন ১০ দিন আগে থেকেই জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। এরপরে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করেছেন, এলএনজি, এসএনজি সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি করেছেন, স্বাভাবিকভাবেই মূল্য বৃদ্ধি হয়েছেÑএটি একটি। আরেকটি হচ্ছে আসলে আমরা যখনই সরকারি দল এবং বিরোধী দল ট্রেডিশন থেকে বের হয়ে আসা উচিত। আমরা সরকারি ট্রেজারি বেঞ্চে বসলেই একটা ম্যাজিক চশমা আমাদের কাছে চলে আসে, এই ম্যাজিক চশমায় আমরা বাজারে গেলেও উর্ধ্বগতিটা আমাদের উর্ধ্বগতি মনে হয় না, মাননীয় স্পিকার। এটি হচ্ছে আমাদের সমস্যা।
তিনি বলেন, ২ লক্ষ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি, এই অর্থায়ন একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জটা মোকাবেলা করার জন্য যে পদক্ষেপ, সেই পদক্ষেপটা কতটা বাস্তবসম্মত হবে? আমরা যদি বৈদেশিক ঋণের দিকে নজর দিই, তাহলে যেটি হবেÑসময়মতো আমরা আমাদের কাজগুলো করতে পারব না। আবার বৈদেশিক ঋণের শর্তগুলো পূরণ করতে গিয়ে আমাদেরকে অনেক কিছু ছাড় দিতে হবে। সুতরাং, বৈদেশিক ঋণের এই লিমিটেশনসকে আমাদের অবশ্যই সামনে রাখতে হবে। আমরা যদি অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভর করি, তাহলে ব্যাংক ভঙ্গুর ব্যাংক ব্যবস্থাকে তুলে উঠানোর যে প্রচেষ্টা, সেই প্রচেষ্টা তো আমরা লক্ষ্য করছি না। বরং বিগত ২০ বছরে যেভাবে ব্যাংক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে, সেগুলো দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য এই ৩ মাসে ৪ মাসে আমরা কোনো অগ্রগতি দেখি নাই। পাশাপাশি বর্তমান ব্যাংক ব্যবস্থাটাও এটাকে সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য যে উদ্যোগ গ্রহণ করার ছিল অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে, সেটিও সম্ভব হয়নি। সুতরাং, আগামী দিনে আমাদের এই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েÑঅথচ অবশ্য ব্যাংকগুলো সরকারকে ঋণ দিতে পছন্দ করে এই জন্য যে এটা রিটার্ন পাওয়া যায়, কিন্তু সামগ্রিকভাবে আমাদের বিনিয়োগ, আমাদের বাণিজ্য, আমাদের শিল্প এবং বেসরকারি কর্মসংস্থান সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বিপর্যস্ত হবে।
তিনি ব্যাংক সর্ম্পকে বলেন, ইসলামী ব্যাংকসহ আরো পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংকের যে তারল্য, যে দুরবস্থা, যে বিপর্যস্ত অবস্থাÑএই সবকিছু থেকেই এটিকে তুলে আনার জন্য রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ করা হোক, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা হোক। আমরা চাই যে এটিকে আগামী দিনে জনগণের আস্থার একটি ব্যাংক হিসাবে ব্যাংক ব্যবস্থা হিসাবে আমরা গড়ে তোলার জন্য সবাই মিলে আমাদের চেষ্টা করা উচিত। এস আলম এবং তার দোসরদেরকে এখানে বসানোর যে প্রক্রিয়া, এই প্রক্রিয়াটা যতক্ষণ পর্যন্ত বন্ধ না হবে জনগণের, বিশেষ করে যারা গ্রাহক, তাদের আস্থা ফিরে আসবে না। ব্যাংকের প্রকৃত মালিকদের হাতে ব্যাংক ফিরিয়ে দিতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। প্রকৃত মালিক বলতে আমরা ব্যাখ্যায় যেটা বুঝেছি, প্রকৃত মালিক বলতে ব্যাংক রেজুলেশন আইন সংশোধনের মাধ্যমে আবার এস আলম এবং তার দোসরদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বুঝানো হয়েছে, আমি যদি ভুল বুঝে না থাকি। দুর্ভাগ্যজনক। প্রকৃত মালিক বলতে এস আলম জোর করে দখল করার আগে এই ব্যাংকের মালিকানায় যারা ছিল, তাদের কাছে ব্যাংক ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত এখানকার গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসবে না, আসার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি আরো বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তায় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমাদের রিনিউয়েবল এনার্জি এবং জ্বালানিÑএটির জন্য যে পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া দরকার ছিল সে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এখানে বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির ক্ষেত্রে বিগত বছরের চাইতে বরাদ্দ কমানো হয়েছে। আমার মনে হয়, এরপরও বরাদ্দ যেটুকু হয়েছে, সেখানে জীবাশ্ম জ্বালানির উপরে একটা বড় ধরনের বরাদ্দ সেখানে আছে। এই ব্যাপারে আমাদের বাজেট প্রক্রিয়ায় সংশোধন আনা উচিত বলে আমি মনে করি। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ঝুঁকি হচ্ছে, সময় শেষ সময়ে যেনতেনভাবে কাজ করে এখান থেকে এখান থেকে নিজেরা নিজেদের পকেট ভারী করার একটা প্রবণতা থাকে কন্ট্রাক্টরের। কন্ট্রাক্টররা এখানে দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এখন যে পদ্ধতি আছে, এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এভাবে এখানে বৃষ্টি এবং বাদলের কারণে দেখা যায় যে কাজগুলো সঠিকমতো হয় না, পানিতেই টাকা চলে যায়। জরুরি ভিত্তিতে কাজ করতে হয়। সুতরাং, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন একটা চ্যালেঞ্জ। তবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আমরা যদি বিশেষ বিশেষ পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করতে পারি, তাহলে আমি আশা করি এখান থেকে হয়তো উত্তরণ পাওয়া সম্ভব হবে।
তিনি আরো বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের দুর্বলতা আমাদের রয়েছে। হাজার শহীদ, পঙ্গুত্ববরণকারীদের স্বার্থ রক্ষায় অনিহা, অবহেলা। জুলাই ফাউন্ডেশনের বেতন এখন পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না, সেটিও একটা জনগণের সাথে, জুলাই যোদ্ধাদের সাথে একটি দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। ৭০ ভাগ জনগণের মতামতকে পদদলিত করে কোনো রায়কে আমলে না নেওয়া, আরো অনেক অনেক বড় ধরনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ। সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার যে প্রত্যাশা ছিল আমাদের, এখানে জনগণ বিক্ষুব্ধ হবে, রাজপথে আসবে, স্বাভাবিকভাবেই বাজেট বাস্তবায়নে একটা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়াÑএটা অসম্ভব নয়।
তিনি বলেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। ১৪ হাজার কোটি টাকা কোথায় ব্যয় হবে, এটি খাত নির্ধারণ করা দরকার। ইবতেদায়ী মাদ্রাসাকে সরকারি করার জন্য সরকারি করার জন্য প্রাইমারি শিক্ষার আদলে গড়ে তোলা দরকার। প্রতিটি জেলায় একটি করে কামিল মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা দরকার। দীর্ঘদিন থেকে বঞ্চিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্ত করার জন্য দাবি জানাচ্ছি। ওয়ার্ডভিত্তিক হেলথ সেন্টার প্রস্তাব করা হয়েছে, কিন্তু ইউনিয়নে হেলথ সেন্টারের যে বেহাল অবস্থা, সেদিকে নজর দেওয়া দরকার। ৫০০০ ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া হবে, প্রতিটি ইউনিয়নে কয়জন করে ভাগে পড়বে? সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই এই অবস্থা দ্রুত উত্তরণের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমাদের স্বাস্থ্য সেক্টরের অবস্থা বেহাল। একটা অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে।