স্টাফ রিপোর্টার : বহু উদ্বেগ উৎকণ্ঠা এবং আলোচনা সমালোচনার অবসান ঘটিয়ে ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার পাগলা থানাকে উপজেলায় উন্নীত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাগলা এবং আদর্শ নগর নামের বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে নতুন উপজেলার নাম দেন দক্ষিণ গফরগাঁও। প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে সব পক্ষ স্বাগত জানিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। একইসাথে জনগণের প্রশাসনিক সেবা প্রাপ্তির সুবিধার কথা বিবেচনা করে উপজেলার মধ্যবর্তী স্থানে অবকাঠামো স্থাপনের আবেদন জানান।

এদিকে ময়মনসিংহের ‘দক্ষিণ গফরগাঁও’ নামের উপজেলা অনুমোদনের পাশাপাশি দেশে আরও দুটি নতুন উপজেলা ও একটি নতুন থানা অনুমোদন দিয়েছে ‘প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার)’।নতুন উপজেলাগুলো হলো চট্টগ্রামের ‘ফটিকছড়ি উত্তর’, কুমিল্লার ‘বাঙ্গরা’ এবং নতুন থানাটি হলো চট্টগ্রামের ‘হালদা’।

প্রসঙ্গত গফরগাঁও উপজেলা ভাগ করে নতুন উপজেলা গঠনের জন্য পাগলা এবং আদর্শনগর নাম নিয়ে যখন স্থানীয় এমপি আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর পক্ষ এবং বিরোধী পক্ষ আন্দোলন পাল্টা আন্দোলন চলছিল তখন দৈনিক সংগ্রাম জনদাবির পক্ষে, ‘নিজের কেনা জমিতে উপজেলা স্থাপন করতে মরিয়া গফরগাঁও উপজেলার এমপি বাচ্চু’ একটি সংবাদ প্রকাশ করে। দৈনিক সংগ্রামের নিউজটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয় এবং ভাইরাল হয়।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নিকারের ১২১তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) বৈঠকে এসব উপজেলা ও থানা অনুমোদন করা হয়েছে। এছাড়া রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন পূর্বাঞ্চল নতুন শহর প্রকল্পের নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার অংশগুলো ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে।’

নিকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা গঠন করা হয়েছে। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলাকে ভাগ করে গঠন করা হয়েছে ‘বাঙ্গরা’ উপজেলা। আর ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পাগলা থানার আটটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠন করা হয়েছে ‘দক্ষিণ গফরগাঁও’ উপজেলা। এছাড়া চট্টগ্রারের হাটহাজারী থানাকে বিভক্ত করে গঠন করা হয়েছে ‘হালদা’ থানা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নিকারের বৈঠকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, সড়ক যোগাযোগমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, গৃহায়নমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।

রাজধানীর যানজট নিরসনে বেঠক

এদিন বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সড়ক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেসসচিব হাসান শিপলু জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজধানীর যানজট নিরসন কীভাবে হবে তা বৈঠকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে রাজধানীর ইনার সার্কুলার রিং রোড নির্মাণ প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা অবহিত করা হয়েছে।

হাসান শিপলু জানান, ঢাকার ইনার সার্কুলার রিং রোড গাবতলী থেকে বাবু বাজার এবেং পোস্তাগোলা থেকে ডেমরা পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের রায়েরবাজার, হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচর অংশের নির্মাণ কাজ চলছে। এই পথে ৪৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়। তিনি জানান, বৈঠকে তুলে ধরা হয় বৃত্তকার এই রিং রোড নির্মাণ হলে ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-মাওয়া ও ঢাকা চট্টগ্রামে যেতে রাজধানীর ভেতরের সড়ক পথ ব্যবহার করতে হবে না। এতে শহরের যানবাহনে চাপ কমবে। একইসঙ্গে যানজটও কমে আসবে।

একইভাবে ঢাকা শহর ঘিরে যে ১১০ কিলোমিটারের নদীপথ রয়েছে সেটি চালু করা গেলে রাজধানীর সড়কে যানবাহনের চাপ কমবে। রাজধানীর বৃত্তকার নদী পথে মানুষজন এক গন্তব্যে থেকে অন্য গন্তবে যেতে পারবে অনায়াসে। এই বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। হাসান শিপলু বলেন, বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা এর কারিগরি দিক উপস্থাপন করেন। নদী পথ ব্যবহার করলে পরিবেশ দূষণমুক্ত থাকবে, জ্বালানি সাশ্রয়ী হবে, সময়ও কম লাগবে বলে বিশেষজ্ঞরা বৈঠকে বলেছেন। কারণ নদীপথের যানবাহনগুলো হবে ইলেক্ট্রিক চালিত।

বৈঠকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব শহীদুল হাসান, সড়ক পরিবহন সচিব জিয়াউল হক, নৌ পরিবহন সচিব মো. জাকারিয়া, রেল পথ সচিব ফাহমিদুল ইসলাম, বিআইডাব্লিউটিএ ‘র চেয়ারম্যান মুহিদুল ইসলাম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী জহিরুল ইসলাম, প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. বোরহান উদ্দিন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খান মাহমুদ আমানত ও অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।

সৌজন্য সাক্ষাৎ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্টসহ একটি প্রতিনিধি দল। বুধবার বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জাপানের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক সংসদীয় উপমন্ত্রী শিমাদা তোমাকি’র নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি সাক্ষাৎ করে। প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি এ তথ্য জানান।

তিনি জানান, সাক্ষাৎকালে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, এমআরটি লাইনসমূহ, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ জাইকা’র অর্থায়নে বাংলাদেশে চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডিসেম্বরের মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধনের লক্ষ্যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বলে জানান উপ প্রেস সচিব।

তিনি আরো জানান, বৈঠকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে জাপানের ৩১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়তা ৫০০ মিলিয়নে উন্নীত করার বিষয়ে জাপান ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। জাহিদুল ইসলাম রনি জানান, এ সময় জাপানি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে জাপানের পক্ষ থেকে পাঁচটি প্যাট্রোল বোট প্রদান করা হবে বলে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করে।

তিনি বলেন, বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে জাপানের অব্যাহত সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক পরিসরে আরো সক্রিয় ভূমিকা আশা করেন।

প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীকে জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানায়। প্রধানমন্ত্রী সুবিধাজনক সময়ে জাপান সফরের আশা প্রকাশ করেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি। সাক্ষাতে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান।

জাপানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি, জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ব্যুরোর পরিচালক হিরোসে আইকো, জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকো এবং জাইকার বাংলাদেশ অফিসের প্রধান প্রতিনিধি তাকাহাশি জুনকো।