সংসদ রিপোর্টার

শেয়ারবাজারে ধারাবাহিক দরপতন ও অনিয়মের মাধ্যমে হাজার হাজার বিনিয়োগকারীকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুঁজিবাজারে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম ও কারসাজির সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে বদ্ধপরিকর সরকার।

গতকাল বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস কে আজিজুল বারীর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর পর্বটি টেবিলে উত্থাপিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির অভিযোগে এরই মধ্যে অনুসন্ধান পরিচালনা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এতে কয়েকজনকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে মামলাসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এ চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা উদ্ঘাটনে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) শেয়ারবাজারে কারসাজির দায়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অর্থদ- আরোপ করেছে। এছাড়া অধিকতর তদন্তের জন্য অভিযুক্তদের তালিকা দুদকের কাছে পাঠানো হয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, বিগত সরকারের আমলে শেয়ারবাজারে ভয়াবহ বিপর্যয়ের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে বাজার কারসাজি ও কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দর নিয়ন্ত্রণ, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ও বন্ড ইস্যুতে বড় ধরনের অনিয়ম, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দীর্ঘদিনের তদারকির ঘাটতি এবং সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া উল্লেখযোগ্য।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং একটি টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ জাতীয় সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলো হলো

১. বিএসইসিতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ।

২. বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার।

৩. লাভজনক সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তকরণে উদ্বুদ্ধ করা।

৪. ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন ও এসএমই কোম্পানিকে বাজারে আনা।

৫. কারসাজি রোধে তথ্য প্রদানকারীর (হুইসেলব্লোয়ার) সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

৬. অডিট ফার্মগুলোর জন্য প্যানেল নীতিমালা প্রণয়ন।

৭. ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স হ্রাস ও লভ্যাংশ আয়ে দ্বৈত কর বাতিল।

৮. পুঁজিবাজার সংক্রান্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা দায়েরের বিধান।

৯. ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন’ এবং বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন।

১০. ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এআইভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু।

১১. ই-কেওয়াইসি ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে লেনদেন সহজীকরণ।

১২. বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল গঠন এবং ট্রেজারি বন্ডের লেনদেন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা।

প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, ‘বর্তমান সরকার শেয়ার মার্কেটের স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে বদ্ধপরিকর। আমরা এমন একটি উন্নত পুঁজিবাজার গড়তে চাই যেখানে বিনিয়োগকারীদের সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে।’

অনার্স পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থা ফ্রি করতে চান প্রধানমন্ত্রী

মেয়েদের স্নাতক (অনার্স) পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থা অবৈতনিক করার পাশাপাশি ভালো ফলাফলের ভিত্তিতে বৃত্তি দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

একই সঙ্গে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ প্রদান এবং কৃষকের সুরক্ষায় পেঁয়াজ-রসুন সংরক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের কথাও জানান তিনি।

গতকাল বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।

সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান বিএনপি সরকার নারী শিক্ষার পাশাপাশি নারী এম্পাওয়ারমেন্ট অর্থাৎ অর্থনৈতিকভাবেও যাতে তারা শক্তিশালী হতে পারে, সেজন্য ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছেন। আমরা একই সঙ্গে আরেকটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, যেটি খালেদা জিয়া সরকার মেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থা ইন্টারমিডিয়েট (এইচএসসি) পর্যন্ত ফ্রি করেছিলেন। আমরা এবার ডিগ্রি বা অনার্স পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থা ফ্রি করতে চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজকে আমাদের সঙ্গে গ্যালারিতে অনেক নারী শিক্ষার্থী উপস্থিত আছে। তারাও সরাসরি এই সংসদ অধিবেশনটি দেখছে। আমরা অনার্স পর্যন্ত যে নারীদের শিক্ষা ব্যবস্থা ফ্রি করব। তাদের মধ্যে যারা ভালো রেজাল্ট করবে, তাদেরকে আমরা স্কলারশিপ দিতে চাই।’

মহিলা আসনের সাংসদ শাম্মী আক্তারের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চাদেরকে স্কুল ড্রেস দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। একই সঙ্গে আমরা তাদেরকে স্কুল ব্যাগও দেব। আমি এখানে সকল সংসদ সদস্যকে আশ্বস্ত করে বলতে চাই, আমরা পর্যায়ক্রমে সমগ্র বাংলাদেশের সরকারি প্রায় ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রায় এক কোটি ২০ লাখের মতো বাচ্চা আছে। আমরা পর্যায়ক্রমে ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত সকল বাচ্চাদের কাছেই পৌঁছানোর চেষ্টা করব।’

রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও কার্যকর সমাধান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যেই নিহিত বলে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সেখানে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।

সংসদ নেতা বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে বৈশ্বিক মানবিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে সরকার জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও দাতা সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ইউএনএইচসিআর, ইউএন উইমেন এবং ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে এবং মানবিক সহায়তা আরও জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করে।

তিনি বলেন, চলতি মাসের শুরুতে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরকালে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন, যার ফলে রোহিঙ্গাদের জন্য তুরস্কের মানবিক সহায়তা আরও বাড়বে বলে সরকার আশা করছে।

গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল বলে স্মরণ করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্বজনমতকে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা চলমান থাকবে। সরকার রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ বিবেচনায় নিয়ে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলার প্রতি বাংলাদেশের নৈতিক সমর্থন চলমান রয়েছে বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।