২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জনপ্রশামনে যুগ্ম সচিবের অনুমোদিত পদ ছিল ৫০২টি। অথচ ওই পদমর্যাদার কর্মকর্তা ছিলেন ১ হাজার ২৭ জন। নতুন করে বিএনপি সরকারও দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় পাঁচ মাসের মাথায় ১৭৯ উপসচিবকে যুগ্ম সচিব করা হয়েছে। ১৭২ জনকে একটি প্রজ্ঞাপনে এবং আরও সাতজনকে পৃথক প্রজ্ঞাপনে পদোন্নতি দেওয়া হয়। ফলে কর্মকর্তার সংখ্যা দাঁড়ায় ১২০৬ জন। জনপ্রশাসনে সুপার নিউমারারি প্রমোশন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

ফলে পদোন্নতির পরও বহু কর্মকর্তা আগের দায়িত্বেই থেকে যান। শুধুমাত্র বদলে গেছে পদমর্যাদা, বেতন ও সুযোগ-সুবিধা। পদোন্নতির সংখ্যার সঙ্গে অনুমোদিত পদের সামঞ্জস্য না থাকাও একটি বড় সমস্যা হযে দেখা দিয়েছে।

সূত্র জানায়, নির্বাচনের পর নতুন সরকার প্রথম বড় প্রশাসনিক পদোন্নতি দিয়েছে। কিন্তু কতটি কার্যকর শূন্য পদের বিপরীতে এই পদোন্নতি, বাছাইয়ের তুলনামূলক মানদ- কী এবং পদোন্নতির পর কর্মকর্তারা কোথায় দায়িত্ব পাবেন, সেসব জানা যায় নি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শূন্য পদ ছাড়াই পদোন্নতি কর্মকর্তাদের ক্ষোভ সাময়িকভাবে কমাতে পারে। কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামোকে ভারী করে। এতে দায়িত্ব ও পদমর্যাদার সম্পর্ক দুর্বল হয়, বেতন-সুবিধার ব্যয় বাড়ে এবং কর্মদক্ষতার বদলে চাপ বা গোষ্ঠীগত দর-কষাকষি ফলপ্রসূ হয় বলে ধারণা তৈরি করে।

সূত্র জানায়, সচিবালয়ের কক্ষ বদলেছে, নামের তালিকা বদলেছে, ‘বঞ্চিত’ কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ পদোন্নতিও পেয়েছেন। কিন্তু বদলি, পদায়ন, ওএসডি, বাধ্যতামূলক অবসর ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষমতা এখনও প্রায় একইভাবে সরকারের হাতে।

ফলে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন রাজনৈতিক সরকার। এই দুই সরকারের পর্ব পেরিয়েও প্রশ্নটি রয়ে গেছে। প্রশাসনে বৈষম্য কমেছে, নাকি শুধু সুবিধাভোগী ও বঞ্চিতদের তালিকা বদলেছে?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ৪৫টি সভা ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পর ১৪ শ্রেণিতে ২০০টির বেশি সুপারিশ দেয়। এর মধ্যে সরকার ১৮টিকে অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

টিআইবির পর্যালোচনা অনুযায়ী, দেড় বছর পর দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে মাত্র তিনটিতে। পাসপোর্টে পুলিশ ভেরিফিকেশন তুলে দেওয়া, সরকারি দফতরে গণশুনানি এবং মহাসড়কের পেট্রলপাম্পে শৌচাগার সংস্কার। অর্থাৎ নাগরিকসেবার কয়েকটি ক্ষেত্রে সামান্য পরিবর্তন এলেও পদোন্নতি, পদায়ন, ক্যাডার পুনর্বিন্যাস, স্বাধীন স্থায়ী জনপ্রশাসন কমিশন, ওএসডি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মতো ক্ষমতা-বণ্টনের সংস্কার আটকে আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী মনে করেন, বৈষম্য কমেছে কিনা, তা শুধু কতজন পদোন্নতি পেলেন এ হিসাব দিয়ে বোঝা যাবে না। দেখতে হবে নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন, বদলি, শাস্তি, ওএসডি এবং গুরুত্বপূর্ণ পদ বণ্টনের নিয়ম কতটা প্রকাশ্য, পূর্বনির্ধারিত ও আপিলযোগ্য হয়েছে।

প্রশাসনের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, পুরোনো সরকারের রাজনৈতিক আস্থার জায়গায় নতুন রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা যেন মানদ- হয়ে না ওঠে, তার কোনও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক রক্ষাকবচ তৈরি হয় নি। অর্থাৎ অন্যায় সংশোধন হয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যতে একই অন্যায় ঠেকানোর স্বাধীন ও আপিলযোগ্য ব্যবস্থা হয় নি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, , বৈষম্য কমবে কীভাবে? বৈষম্য তৈরির যে কাঠামো আগে ছিল, সেই কাঠামোতে কি কোনও পরিবর্তন এসেছে? এটি আগের মতোই রয়ে গেছে। বরং দিন দিন বৈষম্য আরও বাড়বে। ‘তেলা মাথায় তেল দেওয়া’র যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের দেশে চালু রয়েছে, সেই রাজনীতি বহাল থাকলে বৈষম্য কমার কোনও কারণ নেই।

১০১ জন যুগ্মসচিবকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সংযুক্ত

সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে কর্মরত ১০১ জন যুগ্মসচিবকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সংযুক্ত করেছে সরকার। পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে দায়িত্ব পালন করবেন। গত ১২ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উনি-২ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনে সিনিয়র সহকারী সচিব জেতী প্রু স্বাক্ষর করেন।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৯ জুলাই, ২০২৬ তারিখের পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পদোন্নতিপ্রাপ্ত এসব বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (যুগ্মসচিব)-কে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাদের নামের পাশে উল্লেখিত মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সংযুক্তি দেওয়া হয়েছে।

সংযুক্তিকৃত মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে রয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ।’ প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের অনুলিপি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, সরকারি আবাসন পরিদপ্তর, সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ফরমস ও প্রকাশনা অফিস এবং সংশ্লিষ্ট হিসাব ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাঠানো হয়েছে।

জনপ্রশাসন সংস্কার ও পুনর্গঠন কার্যক্রম বাস্তবায়নের অঙ্গীকার

দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ, স্বচ্ছ ও জনমুখী প্রশাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে। গত বছরের জানুয়ারিতে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে বিএনপি মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গৃহীত প্রশাসনিক সংস্কারগুলো যথেষ্ট নয়।

তাই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ পরিষেবা ও জনপ্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে যোগ্য, অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন করে জনপ্রশাসন সংস্কার ও পুনর্গঠন কার্যক্রম বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে রেখেছে বিএনপি। এক্ষেত্রে সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে আসা তিন প্রতিবন্ধকতাÑ দলীয়করণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতির মতো দীর্ঘদিনের চর্চা বর্তমান সরকারকে এখনও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশে জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্য ২৬টি সংস্কার কমিশন বা কমিটি গঠন করা হলেও বাংলাদেশে এখনও গতানুগতিক জনপ্রশাসনব্যবস্থা বহাল রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দলটি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের অঙ্গীকার করেছে। এর মানে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি। মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতিতে যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন, রাজনীতিকীকরণের কারণে জনপ্রশাসনে মেধা ও দক্ষতার গুরুত্ব অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ, পদায়ন-পদোন্নতিতে মেধা ও দক্ষতার স্থান নিয়েছে দলীয় আনুগত্য চাটুকারিতা। কেন্দ্রীভূত ও অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অধীনে জনপ্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতি এবং সুবিধা পেয়ে কর্তৃত্ববাদী সরকার পরিচালনার দোসরে পরিণত হয়েছিলেন। এ কারণেই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত কমিশন জনপ্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর বেশকিছু কাঠামোগত ও পদ্ধতিগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে। জনপ্রশাসন সংস্কার নিয়ে বিভিন্নগোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন ও বিপরীতমুখী মতামতও রয়েছে।

এদিকে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব কারণ জনপ্রশাসনকে নাগরিকদের স্বার্থে কাজ করতে দেয়নি, তার প্রধান কারণ হচ্ছে দুর্নীতির বিস্তার। সরকারি কর্মকর্তারা কখনও কখনও এমন সব একচ্ছত্র ক্ষমতা পেয়ে যান, যার মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কোনো ব্যবস্থা থাকে না। কর্মকর্তাদের সীমাহীন ক্ষমতা এবং জবাবদিহির সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই; বরং প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার কারণেই রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। রাজনীতিবিদদের ব্যবহার করে আমলারা দুর্নীতি করলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা পার পেয়ে যান। শাস্তির আওতায় আনার প্রবণতা কম থাকায় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে বেপরোয়া মনোভাব দেখা যাচ্ছে।

প্রশাসনে দলীয় প্রভাবের দুই ক্ষেত্র

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দুটো ক্ষেত্রে দলীয়করণের অনাকাক্ষিত দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়। প্রথমত, জনপ্রশাসনে দলীয় লোকজনকে নিয়োগ দান, কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে দলীয় মতাদর্শের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রদান করে নিরপেক্ষ বা ভিন্নমতের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বঞ্চিত করে ক্রমান্বয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে বসিয়ে রাখা। এর পাশাপাশি অপছন্দের কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করে তাদের সরকারি দায়িত্ব পালন থেকে সরিয়ে দেওয়া।

দ্বিতীয়ত, আইনানুগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তি কর্তৃক হস্তক্ষেপ এবং তাদের নির্দেশিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে কর্মকর্তাদের বাধ্য করা। বিগত বছরগুলোয় জনপ্রশাসনে দলীয় লোকদের নিয়োগ ও দলীয় কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রদান, সরকারি কর্মকা-ে প্রায় সব আইনানুগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং আইনানুগ সিদ্ধান্তের পরিবর্তে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের স্বার্থে সিদ্ধান্ত প্রদান প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। ফলে দেশে আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত হয়, দুর্নীতির ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায়, বিচারব্যবস্থা স্বাধীনতা হারায়, জুলুম, নির্যাতন বেড়ে যায় এবং গণতান্ত্রিক শাসনের স্থলে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।