সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে কর্মকর্তাদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তকে গুরুতর আদালত অবমাননার শামিল বলে মন্তব্য করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। আদালত বিষয়টি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা সত্ত্বেও সরকারের এই পদক্ষেপ বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি এও বলেছেন, আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ পাওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে সচিবালয় ভেঙে কর্মকর্তাদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্ত দেশের মানুষের কাছে বিচার বিভাগের প্রতি সরকারের আচরণ নিয়ে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে।

এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর ওই রায়ে সুপ্রিম কোর্টের জন্য তিন মাসের মধ্যে স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে বলেছিল।

মঙ্গলবার ওই রায় স্থগিত করে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল শুনানির জন্য ১৬ জুন দিন ঠিক করে দেয়।

এ আদেশের পর সুপ্রিম কোর্ট অ্যানেক্স ভবনের সামনে সাংবাদিকদের এ প্রতিক্রিয়া জানান আইনজীবী শিশির মনির।

তিনি বলেন, “কিন্তু একটি কথা এখানে বলা উল্লেখযোগ্য—সরকারের যে অ্যাপ্রোচ, দ্যাট অ্যাপ্রোচ ওয়াজ নট গুড অ্যাপ্রোচ। হাই কোর্ট বিভাগের এরকম ডাইরেকশন থাকা সত্ত্বেও তারা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়কে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। এই বিলুপ্ত করার যে অ্যাপ্রোচটা তারা গ্রহণ করেছেন, দিস ইজ টেন্টামাউন্ট টু কনটেম্পট অব কোর্ট।”

এ ধরনের কাজ সরকারের পক্ষ থেকে করা উচিত নয় মন্তব্য করে শিশির মনির বলেন, “বিকজ দ্যাট উইল ক্রিয়েট এ নেগেটিভ এক্সাম্পল যে—আদালতের রায় না মানলেও মনে হয় চলে।”

আপিল বিভাগ রায় স্থগিত করার আগেই সচিবালয় বিলুপ্তি করে সরকার ঠিক করেনি বলে মনে করেন আইনজীবী শিশির মনির।

তিনি বলেন, “তাদের স্টে হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা দরকার ছিল। এই স্টে পিটিশনটা আপিল বিভাগে মঞ্জুর হবে কি হবে না, এতটুকু ধৈর্য সরকারের ধারণ করা দরকার ছিল।

“সরকারের এই অধৈর্য—জাতির কাছে একটা নেগেটিভ মেসেজ দিয়েছে যে, তাহলে উচ্চ আদালত এবং বিচার বিভাগের প্রতি তারা এই ধরনের আচরণ কেন করছেন।”

সুপ্রিম কোর্টের জন্য তিন মাসের মধ্যে স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর রায় দিয়েছিল হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ। এ বছর ৭ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়।

এর মধ্যে গত ২০ নভেম্বর আলাদা সচিবালয় করার পদক্ষেপ অন্তর্বর্তী সরকারে অনুমোদন পায়। তার ১০ দিনের মাথায় ৩০ নভেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি হয়।

এ অধ্যাদেশ পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলাজনিত বিষয়, ছুটির পাশাপাশি নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগের সব কিছু সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় দায়িত্ব পায়।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী ১১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪ এ সচিবালয় উদ্বোধন করেন তখনকার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।

তবে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিচারক নিয়োগ ও সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো রহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাস হয়।

এর ফলে বিচারক নিয়োগ ও প্রশাসনিক সব কার্যক্রম আবার পুরোনো কাঠামোয় অর্থাৎ আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরে যায়।

তারই ধারাবাহিকতায় ১৯ মে বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে কর্মরত জুডিসিয়াল সার্ভিসের ১৫ জন কর্মকর্তা ও বিচারককে আইন ও বিচার বিভাগে ফেরত নেওয়া হয়।

কর্মকর্তাদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরানোর সমালোচনা করে শিশির মনির বলেন, “দ্যাট ওয়াজ এ কনটেমশাস ওয়ার্ক ইন মাই ভিউ।

“তারপরেও আজকে থেকে যেহেতু তারা স্টে পেয়েছেন, সুতরাং আজকে থেকে তাদের সামনের কাজগুলো আইন অনুযায়ী হবে, এটা আমরা প্রত্যাশা করি।”

আপিল বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করে সরকার যে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়েছে তার সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আমরা মনে করি, আপিল বিভাগে এই মামলাটি দ্রুততার ভিত্তিতে শুনানি করতে পারলে মূলত মূল সমস্যার সমাধান হতে পারে। এইজন্য পূর্ণাঙ্গভাবে মামলাটা শুনানি হোক, এটা আমরাও সাবমিশন রেখেছি।”

তিনি বলেন, “আদালত ২০২৫ সালে নব্বই দিনের মধ্যে পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা দিয়ে একটি রায় প্রদান করেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল দায়ের করেন এবং এই আপিলের পূর্ণাঙ্গ শুনানি এখনও অনুষ্ঠিত হয় নাই। আপিলের সঙ্গে তারা একটি স্থগিত আদেশ চেয়ে একটি দরখাস্ত দায়ের করেন। এই দরখাস্তটি তারা প্রথম অনারেবল জাজ ইন চেম্বারে নিয়ে যান, সেখানে অনারেবল জাজ ইন চেম্বার কোনো স্থগিত আদেশ দেন নাই।

“এই বিষয়টাকে ফুল কোর্টে রেফার করেন। আজকে এই স্থগিত আদেশের ওপরে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির পরে মাননীয় আপিল বিভাগ এই সচিবালয় প্রতিষ্ঠার যে ডাইরেকশন, এই ডাইরেকশনটাকে স্টে করেছেন আপিল মামলাটা নিষ্পত্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত। এবং একইভাবে এই মামলাটিকে আগামী মঙ্গলবার অর্থাৎ জুন মাসের ১৬ তারিখ এক নম্বর আইটেম হিসেবে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য দিন নির্ধারণ করেছেন।”

আপিল বিভাগে শুনানিতে নিজেদের দেওয়া বক্তব্য উল্লেখ করে আইনজীবী িশশির মনির বলেন, “আমরা প্রথম কথা বলব এবং আজকে বলেছি আংশিক, সেটা হল এই সচিবালয় স্থাপনের আদেশটি করা হয়েছিল পারস্পরিক ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে, ইংরেজিতে বলে কনসেন্টিং ডিক্রি।

“বাংলাদেশের দেওয়ানি কার্যবিধি আইনের ৯৬ ধারা অনুযায়ী যদি কোনো কনসেন্টিং ডিক্রি হয়, অর্থাৎ ঐকমত্যের ভিত্তিতে যদি কোনো সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করা যায় না। তার পরেও সরকার পক্ষ আপিল দায়ের করেছেন এই প্রশ্নে, এটি আমরা উত্থাপন করব।”

বিচার বিভাগের ওপর ‘সরকারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিচার বিভাগ যদি স্বাধীন না হয়, তাহলে শুধুমাত্র সরকার কিংবা বিরোধী দলের ব্যাপার না, জনগণের রক্ষাকবচ বলতে শেষ পর্যন্ত কিছুই আর হাতে থাকে না। এবং নিম্ন আদালতের ট্রান্সফার এবং পদোন্নতি, তাদের শৃঙ্খলা এবং তাদের ছুটি মঞ্জুরি—এগুলো যদি সুপ্রিম কোর্টের উপর ন্যস্ত না রেখে প্রশাসনিক দায়-দায়িত্ব কিংবা সরকারের উপর ন্যস্ত করা হয়, তখন বিচার বিভাগ, অধস্তন বিচার বিভাগ সঠিকভাবে স্বাধীনভাবে ফাংশন করতে পারে না; বিগত বছরগুলো আমাদেরকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

“সুতরাং আমরা চাই বিচার বিভাগ আইন মেনে চলবে, মনস্টার হবে না। সরকার সবসময় আর্গুমেন্ট করে যে, এটা যদি করা হয়- তাহলে বিচার বিভাগ মনস্টার হয়ে যাবে; নো, আমরা কখনোই মনস্টারের পক্ষে নই।

“আমরা বলছি বিচারকদের আচরণবিধি থাকবে, ইন্ডিপেন্ডেন্স থাকবে। আচরণ যদি ভায়োলেট করেন, তাহলে আইন অনুযায়ী বিচার হবে। কিন্তু যদি ইন্ডিপেন্ডেন্স না থাকে, তাহলে জনগণের জন্য তারা ভালো বিচার করতে পারেন না। এইজন্য ইন্ডিপেন্ডেন্স অবশ্যই দরকার।”

বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে প্রধান বিচারপতির এই আপিল শোনা ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের সংঘাত কি না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে শিশির মনির বলেন, “না, এখানে কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট এইজন্য নাই, কারণ এটা হল একটা সিস্টেমের ব্যাপার; এটা কোনো ব্যক্তি বিশেষের ব্যাপার না। এই প্রশ্নের উত্তর ডিসাইডেড হয়ে গেছে ১৬তম সংশোধনীর মামলায়।

“১৬তম সংশোধনীতে যে হাই কোর্ট-সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের জন্য ক্ষমতা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সংবিধান অনুযায়ী সংসদের ওপরে। সেই মামলা হাই কোর্টে চ্যালেঞ্জ হয়ে অসাংবিধানিক ঘোষণা হয়েছে এবং সেটাও তৎকালীন আপিল বিভাগ নিষ্পত্তি করে আপিলকে মঞ্জুর করে...আপিল ডিসমিস করেছেন।

“তার মানে কী? হাই কোর্ট-সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণেরই তো সেই আইন ছিল। তার পরেও তো হাই কোর্টে বিচার হয়েছে, তার পরেও তো সুপ্রিম কোর্টে বিচার হয়েছে। কারণ কী? এগুলো একটা সিস্টেমের ব্যাপার, এগুলো কোনো ব্যক্তি বিশেষের একক কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপার নয়। এইজন্য এটা এখানে কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট হওয়ার কোনো কারণ নাই।”