বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী : রাজশাহী ওয়াসা’র পদ্মা নদীকেন্দ্রিক পানি শোধনাগার ও সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলেছে। তবে এ থেকে পর্যাপ্ত ও বিশুদ্ধ পানি পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। কেননা, ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মার বুকে শুকনো মওসুমে চরের বিস্তার ঘটেই চলেছে। ফলে যথেষ্ট পরিমাণ পানি নদীতে প্রবাহিত হতে পারে না। এই সঙ্গে গঙ্গায় ভারত থেকে পানি প্রবাহের সঙ্গে বয়ে এনে রাজশাহীর পদ্মায় জমা হওয়া বিভিন্ন প্রকার ‘বর্জ্য’ কতোটা বিশুদ্ধ করা যাবে সে প্রশ্নও উঠছে।
বাংলাদেশ-চীনের যৌথ উদ্যোগে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট প্রকল্পটির কাজ এগিয়ে চলেছে। এরই মধ্যে প্রকল্পটি রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। চার বছর মেয়াদের এই প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার তিন বছরের মাথায় অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। একইসঙ্গে নগরজুড়ে পানি সরবরাহের পাইপলাইন বসানোর কাজও এগিয়ে চলছে দ্রুতগতিতে।
প্রকল্পের লক্ষ্য ও অগ্রগতি
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও নগরায়ণের সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে সুপেয় পানির চাহিদাও। বর্তমানে নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ লিটার পানির ঘাটতি রয়েছে। এই সংকট নিরসনে ৪ হাজার ৬২ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্প শেষ হলে রাজশাহী ওয়াসার পানি সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হবে। একইসঙ্গে নগরবাসীর দীর্ঘদিনের বিশুদ্ধ পানির সংকট অনেকটাই দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হয় গোদাগাড়ী উপজেলার জোত-গোসাইদাস এলাকায়। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এই প্রকল্পটি নির্মিত হচ্ছে তিনটি ধাপে। পদ্মা ও মহানন্দা নদীর মোহনায় নির্মাণ করা হচ্ছে ইনটেক পয়েন্ট। এর কাছেই গড়ে উঠছে দৈনিক ২০ কোটি লিটার পানি শোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন মূল ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। আর নগরীর পাশে পবা উপজেলার হরিপুর এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে বুস্টার প্লান্ট। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবগুলো অংশের কাজই এগিয়ে চলছে পরিকল্পনা অনুযায়ী। তারা জানান, মূল প্লান্ট থেকে বুস্টার প্লান্ট পর্যন্ত সাড়ে ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ট্রান্সমিশন লাইনের মধ্যে ২০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। আর নগরবাসীর কাছে পানি পৌঁছে দিতে ১৬ কিলোমিটার ডিস্ট্রিবিউশন লাইন বসানো হয়েছে। চলতি মাসেই আরো ১০ কিলোমিটার লাইন স্থাপনের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সর্বমোট ১৮শ’র বেশি শ্রমিক এই প্রকল্পে প্রতিদিন কাজ করছে। কাজের ৫০ শতাংশ এগিয়ে গেছে। আশা করা যাচ্ছে কাজ খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। তারা আরো জানান, আগামী ২০৩৫ সাল নাগাদ রাজশাহী মহানগরীর যে পানির চাহিদা থাকবে সেটাকে বিবেচনায় রেখে প্লান্টের ক্যাপাসিটি নির্ধারণ করা হয়েছে। ওয়াসা’র দাবি, চার বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, পদ্মা নদীর ইনটেক পয়েন্ট এলাকায় বছরজুড়েই অন্তত ৩০ ফুট গভীরতায় পানি পাওয়া যাবে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে প্রতিদিন ২০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। আর আধুনিক চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার পানির গুণগত মান ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন তারা।
ফারাক্কার বাস্তবতা
এদিকে ফারাক্কা বাঁধের কারণে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের পদ্মায় পানির যে সংকট গত কয়েক দশক ধরে অব্যাহত রয়েছে সেটি বহুল আলোচিত। প্রতিবছর পদ্মার বুকে চরের বিস্তার ঘটে চলেছে। গত অর্ধ শতাব্দীতে পদ্মার প্রস্থ ও গভীরতা প্রায় অর্ধেক কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন গবেষকরা। একারণে ইতোপূর্বে রাজশাহী নগরীতে একাধিক পানি প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে। নগরীর শ্যামপুরের প্রকল্প এর অন্যতম। এছাড়াও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেশ কিছু সেচ প্রকল্পও পদ্মায় পানির অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি সত্ত্বেও রাজশাহী ওয়াসার বর্তমান প্রকল্প কতদিন চলমান থাকতে পারবে সে প্রশ্নও উঠছে।
বর্জ্য ও দূষণ নিয়ে শংকা
অন্যদিকে উজানের দেশ ভারত থেকে পানি প্রবাহের সঙ্গে প্রতিনিয়ত নানাপ্রকার বর্জ্য বাংলাদেশের পদ্মায় এসে মিশছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, যেসব কারণে গঙ্গার দূষণ প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে তার মধ্যে রয়েছে, নদীর ঘাটে ঘাটে আবর্জনার স্তূপ, ভাসমান কঠিন বর্জ্য, সরাসরি গঙ্গাকেই ডাস্টবিনের মতো ব্যবহার, গঙ্গার পাড়ের অসংখ্য শহরের নালা থেকে উপচেপড়া ময়লা পানির স্রোত, জালিবিহীন নালা-নর্দমার মুখ, পূজার দেব-দেবী বিসর্জন, পোড়ানো মৃতদেহের ভস্ম নিক্ষেপ, মানুষের মল-মূত্র সরাসরি নদীতে পড়া, কাপড় কাঁচা ও রান্নার বাসনকোসন ধৌত করা, গবাদী পশু ধোয়ানো, শিল্প-কারখানার বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়া প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও অসংখ্য বাঁধ ও পিলারের সেতু নির্মাণ করে স্রোত বাধাগ্রস্ত করায় পানি দূষিত হচ্ছে। নদীর প্রায় ৮৫ শতাংশ দূষণের কারণ হচ্ছে এই মনুষ্য সৃষ্ট বর্জ্য। দূষণ সৃষ্টিকারী বাকি বর্জ্য আসে কারখানার শিল্প বর্জ্য, কৃষিতে ব্যবহৃত সার, অন্যান্য কঠিন বর্জ্য, মানব শরীর এবং মৃত পশুপাখির দেহ থেকে। ভারতের উত্তর প্রদেশের কানপুর, প্রয়াগরাজ, বারানসী এবং বিহারের পাটনায় অসংখ্য ট্যানারির বর্জ্য, কানপুর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত ৬ লক্ষ মেট্রিক টন কয়লা এবং তার থেকে তৈরি ২ লক্ষ ১০ হাজার টন ফ্লাইঅ্যাশ প্রভৃতি গঙ্গার পানিতে এসে পড়ছে। এছাড়াও বিভিন্ন রাজ্যে রয়েছে হাজার হাজার ইটভাটার ছাই। এসব কারণে গঙ্গা মূলত একটি বিশাল ভাগাড় বা আস্তাকুড়ে পরিণত হয়েছে। এক কোলকাতার তথ্যেই দেখা যায়, এখানে জঞ্জাল ফেলার জন্য আটটি ডাম্পিং সেন্টার রয়েছে গঙ্গার ঘাটগুলোতে। এর মধ্যে পাঁচটির অর্থাৎ ৬৩ শতাংশ কঠিন বর্জ্য ঘাটের পাশ দিয়ে যাওয়া গঙ্গার পানিতে ভাসতে দেখা যায়। কোলকাতা থেকে ভাগীরথী-হুগলির উজানে গেলে দেখা যাবে সেখানে নদীর তীরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ইটের ভাটা আর কয়লা-বিদ্যুত প্রকল্প। এসব প্রকল্প থেকে প্রচুর বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের চেয়ারম্যান কল্যাণ রুদ্র জানান, রাজ্যের কয়েকশত শহর থেকে প্রতিদিন প্রায় ৭ বিলিয়ন টনেরও বেশি অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি চলে যাচ্ছে গঙ্গায়। গঙ্গার বিস্তীর্ণ দুই পাড়ের শত শত কারখানার বর্জ্য, অসংখ্য গ্রাম-শহরের তরল ও কঠিন আবর্জনা, টন টন প্লাস্টিক, এসবই নিস্কাশন খাল-নালা বেয়ে অনবরত এসে পড়ছে নদীতে। কেবলমাত্র কল্যাণী থেকে ডায়মন্ড হারবারের মধ্যেই অন্তত ৩২৪টি ছোটো বড়ো নালা দিনরাত দূষিত পানি ও আবর্জনা ঢেলে দিচ্ছে গঙ্গার বুকে। এভাবেই কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য থেকে শুরু করে মানুষের মলমূত্র প্রতিনিয়ত মিশে যাচ্ছে গঙ্গার পানিতে।
এই বিষয়গুলো আমলে নিয়েই এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে ওয়াসার সংশ্লিষ্টদের দাবি। তবে এবিষয়ে নদী ও পরিবেশ গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, বর্তমান পদ্মার পানি পাইপের মাধ্যমে কৃষি জমিতে সরবরাহ করলে ক্ষতি নেই। কিন্তু যখন খাবার পানি হিসেবে তা সরবরাহ করা হবে তখন হিসাব অন্য রকম দাঁড়ায়। বিশেষ করে শিল্প বর্জ্য ও প্লাস্টিক দ্রব্যের বিষয়ে বেশি সচেতন হতে হবে। নগরীর মানুষের বিশুদ্ধ পানির চাহিদা দীর্ঘ দিনের। এটি পূরণ করতে ওয়াসার এই উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক। কিন্তু গঙ্গার দূষিত পানি কতোটা বিশুদ্ধ করতে পারবে সে প্রশ্নেরও উত্তর থাকতে হবে। আশা করা যায়, ওয়াসা সেদিকে বিশেষ নজর রাখবে।