জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়েছেন দেশের ৬৩ বিশিষ্ট নাগরিক ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। একই সঙ্গে গণরায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। গতকাল বৃহস্পতিবার এক যৌথ বিবৃতিতে তারা এই দাবি জানান।

বিবৃতিতে বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; রাষ্ট্র, রাজনীতি ও নাগরিক সম্পর্ককে নতুন ভিত্তির ওপর পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক আহ্বান। এই গণআকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়ে সরকারের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান ও অনিশ্চয়তায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশিষ্টজনেরা বলেন, সংসদীয় প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার না করেও গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সৃষ্ট ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও জনগণের প্রত্যাশা বিবেচনায় নিয়ে সাংবিধানিক রূপান্তরের কার্যকর পথ নিশ্চিত করা জরুরি।

তারা বলেন, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বৈধতা কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে না; জনগণের ঐতিহাসিক আকাক্সক্ষা, গণআন্দোলনের শিক্ষা এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতিও এর গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। গণরায়ের প্রতি যথাযথ সম্মান না দেখালে রাজনৈতিক আস্থা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হলে অগণতান্ত্রিক ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সেই সুযোগ নিতে পারে। রাজনৈতিক শূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এমন পরিস্থিতি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশ, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিশিষ্টজনেরা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জন কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক সুবিধার বিষয় নয়; এটি জনগণের রাষ্ট্র পুনর্গঠন আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ। সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ, ক্ষমতার সমীকরণ বা প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির সীমাবদ্ধতার মধ্যে এই ঐতিহাসিক সুযোগকে আবদ্ধ করা হলে জাতি একটি বিরল সম্ভাবনা হারাবে।

বিবৃতিতে তিন দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ জুলাই সনদের অঙ্গীকার অনুযায়ী নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে স্বাধীন, কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল ও জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলনকারী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন; জনগণের প্রত্যাশা ও গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষাকে উপেক্ষা করে কোনো সাংবিধানিক পরিবর্তনের উদ্যোগ না নেওয়া এবং দলীয় লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া।

বিবৃতিতে দেশের জনগণ, বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় বিশ্বাসী নাগরিক ও গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে নীরব দর্শক না থেকে সক্রিয় নাগরিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানো হয়।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, অহিংস গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল বাশার, জেএসডির সিনিয়র সহসভাপতি তানিয়া রব, নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের মুখপাত্র ফেরদৌস আরা রুমী, শিক্ষক হেলাল মহিউদ্দীন, অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিম রেজা নিউটন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সৈয়দ নিজার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুশাদ ফরিদীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সংগঠনের ৬৩ জন প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট নাগরিক।