সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জোরদার হচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতি দল সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে থাকা পুরানো মামলা তদন্তের দাবি করছে। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সাহাবুদ্দিন ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের সুবিধাভোগী ছিলেন। দুর্নীতিদমন কমিশন (দুদক) ও ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেলেঙ্কারিসহ যেসব অভিযোগ রয়েছে তার তদন্ত দাবি করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার দাবি ওঠছে। ইতিমধ্যে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার জালিয়াতিতে জড়িত ছিলেন সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ও তার কোম্পানি জেএমসি বিল্ডার্স। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে চুপ্পুর বিরুদ্ধে দুদককে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

জেএমসি বিল্ডার বিতির্কিত ব্যবসায়ী ও হাসিনা আমলের অর্থ পাচারের অলিগার্ক এস আলমের মালিকানাধীন কোম্পানি হলেও শেয়ারের অধিকারী ছিলেন সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। এ বিষয়ে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। বিচারপতি মুজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ অনুসন্ধান ও তদন্তের নির্দেশনা দিয়েছেন। গতকাল শনিবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। জেএমসি বিল্ডার্স কোম্পানিরই অন্যতম মালিক ও প্রতিনিধি হিসেবে জালিয়াতির মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেনায় জড়িত ছিলেন তিনি। সেই শেয়ার কেনার অর্থও লুট করা হয় এস আলমের দখলকৃত ইসলামি ধারার আরেক ব্যাংক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে। এ ভুয়া কোম্পানি জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবেই সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ও পরে ভাইস চেয়ারম্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময় ব্যাংকটি থেকে লুটপাট করা হয় বিপুল অর্থ। বিএফআইইউ’র তদন্তে এসব তথ্য ওঠে আসে এবং সাহাবুদ্দিন চুপ্পুসহ কোম্পানির অন্যদেরও অভিযুক্ত করা হয়। এ প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পুরো বিষয়টি তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্ট দুদককে নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়ে সব অভিযোগ ও আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন সাহাবুদ্দিন। পদত্যাগের পর সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘কীসের বিচার করবে? কীসের? কীসের বিচার করবে? সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ পড়ে দেখুক।’

সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে দুই ধরনের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ৫১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বা অনুরূপ বিবেচনায় কোনো কাজ করলে বা কোনো কাজের ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় থাকলে, সেটির জন্য কোনো আদালতে তার জবাবদিহিতা থাকবে না। তবে এই সুরক্ষা সরকারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করে না। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫১(১) অনুচ্ছেদের সাংবিধানিক সুরক্ষা কেবল রাষ্ট্রপতির পদে থাকাকালীন নয়, বরং দায়িত্ব পালনকালীন করা কাজের জন্য পদ ছাড়ার পরেও বলবৎ থাকে। সংবিধানের ৫১(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালীন আলাদা সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে আসীন রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যধারা দায়ের করা বা চালু রাখা যাবে না। একইসঙ্গে তার গ্রেপ্তার বা কারাবাসের জন্য কোনো পরোয়ানা জারি করা নিষিদ্ধ। যেহেতু সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন, তাই এই সুরক্ষা তার ক্ষেত্রে আর প্রযোজ্য নয়। আইনজ্ঞরা আরও বলছেন, ৫১ অনুচ্ছেদ সব কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে পূর্ণ দায়মুক্তি দেয় না। দাপ্তরিক দায়িত্বের বাইরের কাজ, দুর্নীতি, ফৌজদারি অপরাধ বা রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কোনো অপরাধ এই সুরক্ষার আওতায় পড়ে না। ফলে দাপ্তরিক সীমার বাইরের কাজের জন্য সাবেক রাষ্ট্রপতিকেও আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা সম্ভব।

এদিকে, পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পরই সংবাদ সম্মেলন করে মো. সাহাবুদ্দিনকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির দাবি, রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে যাওয়ার পর তার কোনো আইনগত দায়মুক্তি নেই। তাই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সাহাবুদ্দিনকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক। এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম জামালপুরে এক পদযাত্রা অনুষ্ঠানে বলেন, ফ্যাসিবাদের দোসর চুপ্পু (রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন) পদত্যাগ করলেই হবে না, পদত্যাগের পরে তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে। কারণ, গণহত্যায় তার সমর্থন রয়েছে, দুর্নীতিতে তার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। তাকে অবিলম্বে অপসারণ করে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং বিচারের আওতায় আনতে হবে। আইনজ্ঞদের মতে, অতীতের কর্মকাণ্ডের জন্য অনায়াসে সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তার কিংবা বিচারের আওতায় আনা যাবে। তবে সবকিছু নির্ভর করবে সরকারের ওপর।

যা বলেছেন আইনমন্ত্রী

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিরুদ্ধে কোনো মমলা থাকলে খতিয়ে দেখা হবে। সেগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, সেটাও দেখা হবে। গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর সিরডাপে মানবাধিকারবিষয়ক পরামর্শসভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আইনমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলনে আহত আটজনের বিরুদ্ধে করা মামলা যদি মিথ্যা হয়, তাহলে তা প্রত্যাহার করা হবে।