বিরোধী দলের আপত্তির মুখে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় সংশোধনী বিল ২০২৬। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে এ বিল পাস হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেনের প্রস্তাবে সংসদে কন্ঠভোটে তা পাস হয়। তার আগে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এ বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রস্তাব করলে তা কন্ঠভোটে নাকচ হয়।
বিলের আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সংশোধনী বিল সর্ম্পকে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিষয়টা জনস্বাস্থ্য এবং জনস্বার্থ সংক্রান্ত। আমি জাস্ট আমার কনসার্নটা ব্যক্ত করছি। এখানে আইনের সংশোধনীতে বলা হয়েছেÑপ্রফিট, নন-প্রফিট দুইভাবেই এখানে এঙ্গেজ হওয়ার সুযোগ আছে। স্বাস্থ্যসেবা জনগণের অধিকার, কিন্তু আমাদের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা শতভাগ সেটা নিশ্চিত করতে পারছি না। এর মধ্যে সরকারি যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলো তার সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সেবা দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশে টারশিয়ারি লেভেল স্বাস্থ্যসেবা সরকারিভাবে একটাই, সেটা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। এই জায়গাতে কারা আসে? যাদের সামর্থ্যে কুলায় না বাইরে প্রাইভেট টারশিয়ারি লেভেলের চিকিৎসা সেবা নেওয়ার, তারা এখানে আসেন। এখন এখানে যদি আবার প্রফিট বেসড কোনো ইনিশিয়েটিভ নেওয়া হয় বা যুক্ত করা হয়Ñএখানে জয়েন্ট স্টক কোম্পানি থেকে এটার রেজিস্ট্রেশন নিতে হবে। জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে রেজিস্ট্রেশন যারা নেয়, নেচার দুই ধরনের। একটা হচ্ছে বিজনেস বেসড, আরেকটা হচ্ছে চ্যারিটি বেসড। এখানে যদি শুধু চ্যারিটির মধ্যে, নন-প্রফিটের মধ্যে কিছু থাকে আমার কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু প্রফিট কনসার্ন কিছু আসলেই জনগণের ওপরে কিন্তু আবার একটা বড় ধরনের দায় চাপবে। যেটুকু স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যাচ্ছে সেটাও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। তারপর এটাকে অপারেট করতে গিয়ে মেকানিজম যেটা করা হবে, সেখানে আমরা শতভাগ যদি ট্রান্সপারেন্সি নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে যা আছে সেটাও শেষ হয়ে যাবে আমি মনে করি। আমার এই ধারণা থেকে আমি অনুরোধ করব যে, মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার বিলটাই প্রত্যাহার করুন। আরো চিন্তাভাবনা করে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি গঠন হোক, তারা আরো বিবেচনা করে ভবিষ্যতে যদি কোনো জনকল্যাণকর বিল আনতে হয় তাহলে সেটা আনাই যুক্তিসঙ্গত হবে বলে আমি মনে করি।
জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, হাসপাতালটিতে গরীব মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে। এটির চিকিৎসা আরো উন্নত হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মানুষ হিসেবে ভুল বোঝাবুঝি হওয়া অস্বাভাবিক না। যে হাসপাতালটা এখন অব্যবহৃত অবস্থায় আছে, এটা কিন্তু ফ্যাসিস্ট আমলে তৈরি করা হাসপাতাল। তারা এটা চালু করে নাই। তারা কি তখন এইরকম কোনো কাঠামো আইনি কাঠামো তৈরি করেছিল, যে এটাকে প্রফিট অর নন-প্রফিটÑ দুইটা কথাই এখানে ইউজ করা হয়েছে। জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে যে রেজিস্ট্রেশনগুলা হয় দুই ভাগে হয়, একটা চ্যারিটিÑ এখান থেকে কোনো প্রফিটের প্রশ্নই উঠে না। চ্যারিটিতে প্রফিট হলেও এইটা রিইনভেস্ট হবে ওখানে। আর প্রফিট যেটা সেটা লিমিটেড কোম্পানি, প্রাইভেট হতে পারে, পাবলিক হতে পারে। লিমিটেড কোম্পানির প্রশ্ন যেখানেই আছে, সেখানে লাভ লোকসানের প্রশ্ন আছে। এই জায়গায় আমরা খুবই আনন্দিত হব, যে হাসপাতালটা তৈরি হয়েছে এটাও যদি সাধারণ মানুষের জন্য ফুললি ডেজিগনেটেড হয়। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, আমি সম্মানের সাথেই বলতেছি, উনি বলছেন গরিবদেরও এখানে একটা স্টেক থাকবে। আমি বলি কোটা না, যেভাবে পিজি থেকে আজকে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে ক্রমান্বয়ে, এইটাও তার অন্তর্ভুক্ত হয়ে একটা নতুন মডেল এই সরকার জনগণকে উপহার দিক। এবং এখানে ১০% বা ৯০% এর কোনো বিষয় না থাকুক, পুরাটাই সরকারের নিজস্ব অবস্থান থেকে করা হোক। সরকার আজকে একটা দল পরিচালনা করছে, কালকে হয়তো আরেকটা দল আসবে, কিন্তু ভালো কিছু সৃষ্টি করলে মানুষ চিরদিন মনে রাখবে। আর এইটার সুবাদে যখন স্পেশালাইজড হসপিটাল হবে, স্বাভাবিক এটার কস্ট স্বাভাবিকভাবে হবে না। বিদেশের চেয়ে কম হলেও অনেক বেশি হবে কস্ট, বেশি কস্ট তো আর কমাইতে পারবে না। তো এই জায়গায় গরিবরা আবার আনঅ্যাফোর্ডেবল হয়ে যাবে, অ্যাফোর্ডেবল হবে না তাদের জন্য। আমি বিষয়টা আবারও বিনয়ের সাথে অনুরোধ করছি আরো বেশি যাচাই-বাছাই করে, এই সংসদই পাস করে দিক, অসুবিধা নাই, কিন্তু আরো সুন্দরভাবে আসুক, জনস্বার্থ সংরক্ষণ করে আসুক। এইভাবে আসলে দেশবাসী খুশি হবে, আর এই সংসদও গ্লোরিফাই হবে।
বিলের আলোচনায় জি এম নজরুল ইসলাম বলেন, ১৯৯৮ সালের মূল আইনের উদ্দেশ্য ছিল দেশে উচ্চতর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা, বিশ্বমানের গবেষণা ও সাধারণ মানুষের জন্য উন্নত স্বাস্থ্য সেবা প্রতিপালন করা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এই সংশোধনী বিলের মাধ্যমে চিকিৎসা শিক্ষাকে সেবার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বাণিজ্যের হাতে তুলে দেওয়ার একটা সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। এই সংশোধনীতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে মুনাফাভিত্তিক ও অমুনাফাভিত্তিক কোম্পানির সংগঠন গঠন করার আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এবং সরকার বলছে নবনির্মিত সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল পরিচালনার সুবিধার্থে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা সেবা এখন একটা ব্যবসায় রূপান্তরিত করা হয়, সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা পাওয়া খুব কঠিন হয়ে যাবে।
শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যর যে আমাদের মৌলিক মানবাধিকারের বিষয়ের মধ্যে স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অথচ আমরা লক্ষ্য করি বিশ্বে আমাদের এখন হেলথকেয়ার ইনডেক্স যেটা আছে, সেই ইনডেক্সে আমরা ৯৭টি দেশের মধ্যে ৯৬তে এমনিতেই আছি। এরপর যদি এটাকে কোম্পানি আইনে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে এই স্পেশালাইজড হাসপাতালের মাধ্যমে আমরা ব্যবসায়ে পরিণত হয়ে এরপর এক তালিকার বাদ আছে, অর্থাৎ ৯৭ থেকে আমরা ৯৬তে আছি, তারপর আর কোথায় যাব? আমাদের নামারও তো আর কোনো জায়গা নেই। আমার মনে হয় সেই জায়গাটাও যেমন দেখা দরকার, এশিয়ার তালিকার ৩৩টি দেশের মধ্যে আমরা ৩৩ নাম্বারে আছি। আমাদের আর নিচে নামার কোনো জায়গা নেই । আমি স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয়কে অনুরোধ করব আপনার মাধ্যমে, যে এটি যাচাই-বাছাই পূর্বক সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা হয়, সেই বিষয়টি দেখার জন্য আমাদের এমন পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত।
মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয় সংশোধনী বিল, ২০২৬Ñএই বিলটি এখানে পেশ করার আগে আমি অনুরোধ করতে চাই যে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির গঠন হোক। সেই স্থায়ী কমিটিতে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সামগ্রিকভাবে এদেশের জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত আসুক, সেটি গ্রহণযোগ্য বলে আমি মনে করি। এইজন্য বাংলাদেশের মেডিকেল সেক্টরকে আমরা যদি আবারও বাণিজ্যকরণ করি সরকারের উদ্যোগে, এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমি এইজন্য আবারও বলতে চাই যে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির মিটিংয়ে এটা পাঠানো হোক গঠিত হওয়ার পরে, এবং এরপরেই সংসদে আসুক।