৩০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ও শীর্ষ সম্মেলন আগামী বছর ঢাকাতে

আগামী বছর ২০২৭ সালে ৩০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন ও শীর্ষ সম্মেলন আগামী বছর ঢাকাতে অনুষ্ঠিত হবে। সেই লক্ষে বিমসটেককে কার্যকর কানেক্টিভিটি বাড়াতে ঢাকার নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতার জোট বিমসটেক কেন্দ্রিক আঞ্চলিক অর্থনীতি ও ভৌগোলিক ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে একটি বড় ধরনের রূপান্তর ঘটছে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সেতুবন্ধন হিসেবে পরিচিত এই সংস্থাটিকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশ এবার আরও জোরালো ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সেই লক্ষ্যে গত ২০ জুলাই বিসের উদ্যোগে বিমসটেক-এর তিন দশক : যৌথ সমৃদ্ধির লক্ষ্যেআঞ্চলিক সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করে। ঐ সেমিনারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এমপি এবং বিমসটেকের মহাসচিব রাষ্ট্রদূত ইন্দ্র মণি পান্ডে বক্তব্য রাখেন। এরপরের দিন গত ২১ জুলাই বিমসটেক সদর দফতরে কূটনৈতিক রিপোর্টারদের নিয়ে একটি আলোচনা অনুষ্ঠান হয়। সেখানেও সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ পরামর্শ দেন, যে কিভাবে বিমসটেককে কর্যকর করা যায় এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলো এর মাধ্যমে কিভাবে সুবিধাভোগ করতে পারে। এছাড়াও রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিমসটেক সূত্রে এইসব তথ্য জানাযায়। এদিকে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মহামারি ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক জটিলতার মধ্যেও বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য ও মুক্ত যোগাযোগের যে বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তাকে বাস্তবে রূপ দিতে ঢাকাকে আরও গতিশীল ভূমিকা পালনে তাগিদ দিচ্ছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

সূত্রে জানাযায়, ১৯৯৭ সালের ৬ জুন ব্যাংক ঘোষণার মাধ্যমে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিমসটেক সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৮০ কোটি যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২২%, সমুদ্রবন্দর ছোট বড় মিলিয়ে ২০টির বেশি এবং সমুদ্র বন্দরকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বয়িক জিডিপির বিশাল বাজার হাতে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, বার্ষিক বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১.৯৫ ট্রিলিয়ন (১৯৫০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। তবে জোটের নিজেদের ভেতরের আন্তঃবাণিজ্য ৪৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বিমসটেক দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের বার্ষিক মোট বাণিজ্য প্রায় ১৩-১৫ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে সিংহভাগই আমদানিনির্ভর, ফলে আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের সাথে (বিশেষ করে ভারত ও থাইল্যান্ডের সাথে) বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৮ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে থাকে। বিমসটেকের সদস্য দেশগুলোর মোট সমুদ্র উপকূল রেখার দৈর্ঘ্য প্রায় ১২,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি এবং সমুদ্র সম্পদ আহরণের মাধ্যমে ব্লু ইকোনমির অপার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান সদস্য রাষ্ট্র সংখ্যা ৭টি (দক্ষিণ এশিয়ার ৫টি: বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভূটান, শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ২টি: মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড)। বিমসটেকের স্থায়ী সচিবালয় বা সদর দপ্তর বাংলাদেশের ঢাকাতেই অবস্থিত। বিমসটেকের সর্বশেষ শীর্ষ সম্মেলনটি ছিল ৬ষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলন, যা ২ থেকে ৪ এপ্রিল ২০২৫ সালে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৭ সালে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে বাংলাদেশে। বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান দেশ বাংলাদেশ, এবং ২০২৭ সালে সংস্থাটির ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এই শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানাযায়, বাংলাদেশ বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোতে ঐতিহ্যবাহী পণ্য ছাড়াও নতুন নতুন পণ্যের বাজার তৈরি করতে পারে। যেমন: শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও ভারতে সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরির তৈরি পোশাক। মিয়ানমার, নেপাল, ভূটান ও শ্রীলঙ্কায় মানসম্পন্ন বাংলাদেশী ওষুধের অনেক চাহিদা রয়েছে। থাইল্যান্ড ও ভারতের বাজারে প্রিমিয়াম চামড়াজাত পণ্য নতুন বাজার সৃষ্টি করার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও বিস্কুট, জুস, শুকনো খাবার ও প্যাকেটজাত খাদ্য সামগ্রী; গৃহস্থালী প্লাস্টিক পণ্য ও দেশে উৎপাদিত ইলেকট্রনিক সামগ্রী বিশাল বাজার রয়েছে বিমসটেক সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে।

কূটনৈতিক ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগ সুবিধা ও সমুদ্রপথে জাহাজের মালামাল পরিবহণ চুক্তি চূড়ান্তকরণ এখনই জরুরী হয়ে পড়েছে। বিমসটেক উপকূলীয় নৌ-পরিবহন চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরাসরি শিপিং রুট চালু করা। বিমসটেক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দ্রুততম সময়ের মধ্যে চুক্তি কার্যকর করার জন্য ঢাকাকে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে হবে। নেপাল ও ভূটানের সাথে বাংলাবান্ধা ও বুড়িমারী স্থলবন্দরের সংযোগ এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের ফিডার সার্ভিস জোরদার করা। সদস্য দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে শুল্ক জটিলতা সহজ করা।

তারা আরও বলেন, যদিও বিমসটেকের মূল ম্যান্ডেট হলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহযোগিতা, তবে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ উভয়ই এই আঞ্চলিক জোটের সদস্য। বহুপাক্ষিক এই প্ল্যাটফর্মের অপ্রাতিষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং অর্থনৈতিক সমন্বয়ের ফাঁকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির তাগিদ দেওয়া সম্ভব। আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে যে বিশাল কানেক্টিভিটি প্রজেক্টগুলো বাধার মুখে পড়বে; সেই বার্তা মিয়ানমারকে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিমসটেক একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অনানুষ্ঠানিক মঞ্চ হতে পারে।

সম্প্রতি ঢাকায় বিমসটেক মহাসচিব ইন্দ্র মণি পান্ডে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিকাব)-এর সাথে মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। বিমসটেক সচিবালয়ে আয়োজিত উক্ত মতবিনিময় সভায় মহাসচিব বলেন, ‘‘বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলটি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় কেন্দ্র। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও অবাধ চলাচলের ক্ষেত্রে বিমসটেক দেশগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করেছে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর করা এবং গ্রিড ইন্টারকানেকশনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বাণিজ্য শুরু করাই এখন আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য।”

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এমপি এই বিষয়ে বলেন, বিমসটেকের ওপর একটা সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিমসটেকের ইনিশিয়েশনের পর থেকে কি পরিবর্তন হয়েছে, কি প্রয়োজন বিমসটেককে নিয়ে করার; সেটা আলোচনা হয়েছে। বিমসটেক অবশ্যই আরেকটি একটা মাল্টিলেটারাল কানেক্টিভিটির একটি প্ল্যাটফর্ম। যেটার মাধ্যমেও বিমসটেকের, সেগুলো অনেকগুলো দেশ সার্কভুক্ত এবং কযেকটি দেশ সার্ক প্ল্যাটফর্মে নেই। তো অবশ্যই এটা পরিষ্কার যে, সার্ক এবং বিমসটেক দুটোই একটা আরেকটাকে কমপ্লিমেন্ট (পরিপূরক) করে। এবং দুটোই কো-এক্সিস্ট (সহাবস্থান) করতে পারে। এবং সার্ক ও বিমসটেক দুটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই আমরা বাংলাদেশ এবং আমাদের এই অঞ্চলের দেশগুলোর এবং মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন করতে পারি।

বিমসটেক-কে কার্যকর কানেক্টিভিটি বাড়াতে ঢাকার নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগে বাণিজ্য বাড়াতে কাজ করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি অনুবিভাগ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি অনুবিভাগের মহাপরিচালক এবং চিফ ইনোভেশন অফিসার ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন বলেন, অর্থনৈতিক কূটনীতিতে জোর দিচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমাদের মূল লক্ষ্য হলো আন্তঃযোগাযোগ বা কানেক্টিভিটি বৃদ্ধি করা। যেমন: বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কানেক্টিভিটি, অর্থায়নের ক্ষেত্রে কানেক্টিভিটি, সুযোগ ও অংশীদারিত্বের সমতার ক্ষেত্রে কানেক্টিভিটি। সহজ কথায়, উৎপাদন ও ব্যবসার প্রতিটি ক্ষেত্রে একটা শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আমরা আশা করি, এর মাধ্যমে উৎপাদনের সক্ষমতা, পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থা এবং কাজের ক্ষেত্রে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করার এক নতুন উদ্ভাবনী ক্ষেত্র তৈরি হবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধিকে আরও বিস্তৃত, গভীর ও সমৃদ্ধ করা। এর ফলে, আমাদের যেসব সম্পদ বা সক্ষমতা আগে থেকেই তৈরি আছে, সেগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যাবে। একই সাথে আমরা নতুন উদ্ভাবন ও নতুন পণ্য বা সেবা তৈরির মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে যৌথভাবে কাজ করার সুযোগ পাব। আমরা মনে করি, কেবল অর্থ বা মুদ্রা দিয়েই একটি দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা প্রকাশ করা যায় না। যেখানে যেখানে ঘাটতি বা দুর্বলতা আছে, রাষ্ট্রকে সেসব জায়গা পূরণে এগিয়ে আসতে হবে। তবে এই সহযোগিতা এমনভাবে হতে হবে, যাতে বেসরকারি উদ্যোক্তা বা মুক্তবাজারের স্বাধীন উদ্দীপনা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। একই সাথে, দেশের নাগরিকেরা যেন তাদের নিজ নিজ পছন্দের ক্ষেত্রে ন্যায্য ব্যবসায়িক ও উদ্যোক্তা মূলক স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সাহাবুল হকের মতে, বিমসটেক বাংলাদেশের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক বাজারের (যেমন: থাইল্যান্ড ও আসিয়ান অঞ্চল) প্রবেশদ্বার। সার্ক দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে থমকে থাকলেও বিমসটেককে সচল রেখে বাংলাদেশ তার দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সুবিধা আদায় করতে পারে। সার্ক এবং বিমসটেক দুটি সমান্তরাল সংস্থা হিসেবে একে অপরকে সহযোগিতা করতে পারে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে আরও কার্যকরভাবে আঞ্চলিক হাব হিসেবে প্রস্তুত করা না গেলে বিমসটেকের পূর্ণ সুবিধা নেওয়া সম্ভব হবে না। বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে থাকায়, বিমসটেক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত স্বাক্ষর ও কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরি। বার্ষিক বাণিজ্য ১৫ বিলিয়ন থেকে ৫০ বিলিয়নে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ হাতে নেওয়া দরকার