দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেওয়ায় বেসরকারি চাকরিজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি হলেও সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা মাত্র প্রায় ১৪ লাখ। ফলে বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাচ্ছেন জনসংখ্যার খুবই ছোট একটি অংশ। অন্যদিকে অধিকাংশ মানুষের আয় অপরিবর্তিত থাকায় মূল্যস্ফীতির চাপ বহন করতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকেই। এতে সরকারি চাকরিজীবীদের আয়ের পরিবর্তন হলেও বাকি মানুষের আর্থিক সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
এদিকে রমজানের ঈদকে কেন্দ্র করে এক দফা বেড়েছিল বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম। পরে কোরবানির ঈদ উপলক্ষেও বাড়ানো হয় বেশ কিছু পণ্যের মূল্য। বাজারে এসব পণ্যের সরবরাহে তেমন কোনো ঘাটতি না থাকলেও ঈদ শেষ হওয়ার পরও দাম আর কমেনি। ফলে নিম্নবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোরও সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষের জন্য মাছ, মাংসসহ অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য এখন অনেকটাই নাগালের বাইরে চলে গেছে। অনেকেই প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও এসব পণ্য কিনতে পারছেন না। কোরবানির ঈদের পর বাজার কিছুটা স্বাভাবিক হবে এবং পণ্যের দাম কমবে—এমন প্রত্যাশা ছিল অনেক ক্রেতার। কিন্তু শুক্রবার বাজারে গিয়ে তারা সেই আশার প্রতিফলন দেখেননি। বরং আগের উচ্চ দামই বহাল থাকায় হতাশ হয়েই ফিরতে হয়েছে অনেককে।
জুনে দেশে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জন্য বড় কোনো স্বস্তি আসেনি। কারণ ধারাবাহিকভাবে তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির চাপ এখনো কাটেনি। বরং সীমিত আয়ের ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যয় সংকোচনের প্রবণতা আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত জুন-২০২৬ মাসের ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুনে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগের মে-তে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি দশমিক ২৬ শতাংশ কমলেও তা এখনো ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ঘোষিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে সাধারণ মানুষের ওপরও চাপ বাড়তে পারে। কারণ দেশের সাড়ে ১৪ লাখের বেশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বাড়লে শুধু মূল্যস্ফীতিই নয়, বৈষম্য, দারিদ্র্য, তারল্য সংকটসহ আর্থসামাজিক নানা ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য যে ধরনের পরিকল্পনা ও পূর্বপ্রস্তুতি প্রয়োজন, সরকারের সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া উচিত।
শুক্রবার রাজধানীর কাওরান বাজার, নয়াবাজার, মালিবাগ কাঁচাবাজারসহ একাধিক খুচরা বাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এদিন প্রতিকেজি সরুচাল ৮৫-৯০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মাঝারি আকারের চাল বিক্রি হয়েছে ৬৮ টাকা। আর মোটা চাল বিক্রি হয়েছে ৫৫-৬০ টাকা। পাশাপাশি প্রতিকেজি সরু দানার মসুর ডাল বিক্রি হয়েছে ১৬০ টাকা। খুচরা বাজারে প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগেও ১৬০-১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পাশাপাশি প্রতি ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৩০ টাকা। যা গত সপ্তাহে ছিল ১১৫-১২৫ টাকা।
এছাড়া গরুর ও খাসির মাংসের দাম যেন ক্রেতার নাগালের বাইরে। গরুর মাংসের কেজি বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৮৫০ ও খাসির মাংস ১২০০ টাকায়। সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ৫ টাকা বেড়ে দেশি পেঁয়াজ সর্বোচ্চ ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লিটারপ্রতি বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়।
খুচরা পর্যায়ে প্রতিকেজি লম্বা বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৮০-৯০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এছাড়া গোল বেগুনের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৯০-১০০ টাকা। মানভেদে প্রতিকেজি করলা বিক্রি হচ্ছে ৬০-৭০ টাকা। চিচিংগা প্রতিকেজি ৬০ টাকা, কচুরমুখি ৬৫-৭০ টাকা কেজিদরে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের মাছ। খুচরায় মানভেদে চিংড়ির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০০-৮০০, পাবদা ৩০০-৪০০, বড় আকারের রুই কেজিপ্রতি ৪০০-৪৫০, ট্যাংরা ৬০০-৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিকেজি ভেটকি ৪০০-৫৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২২০-২৩০ টাকা, পাঙাশ ২০০-২২০ টাকা, মৃগেল ২৫০-৩০০ টাকা, বাইম ৬০০-৮০০ টাকা, কৈ ৪০০-৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মালিবাগ কাঁচাবাজারে নিত্যপণ্য কিনতে এসেছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. হাসনাত (৪৭)। তিনি বলেন, আমি মাসে ৩৫ হাজার টাকা বেতন পাই। তা দিয়ে পরিবারের ছয় সদস্যের সংসার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। খেয়ে বেঁচে থাকতে অল্প পরিমাণে পণ্য কিনতে হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি হচ্ছে। তারা স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটালেও আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপে সবাই পিষ্ট। সরকারি কর্মচারীদের প্রণোদনা দেওয়ায় তাদের একটু হলেও স্বস্তি হবে। কিন্তু বাকি জনগণের কী হবে? কারণ বাজারে সবাই যায়। তাই সরকারের উচিত হবে, দেশের সব মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতি কমানোর ব্যবস্থা করা। পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যবস্থা করা। টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বেশি করে ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করা। এতে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরবে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কিন্তু প্রতিযোগিতা নেই। কিছু অসাধু বিক্রেতা সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাকে নাজেহাল করে তুলছেন। দেখার জন্য যারা আছেন, তারাও রহস্যজনক কারণে নিশ্চুপ।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ঘোষিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। ফলে ১৪ লাখ কর্মকর্তা সুবিধা পাবে। তারা নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম কিছুটা হলেও সামাল দিতে পারবেন। কিন্তু অন্যদের জন্য কোনো সুখবর নেই। বাজারে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হওয়ার মতো পরিস্থিতি হয়েছে। ফলে এই অবস্থা থেকে তাদের বের করে আনতে হবে। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।