ইবরাহীম খলিল

ফাতেমা তাসনিম জুমা। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সংসদ (ডাকসু)র মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক। একইসাথে জুলাই আন্দোলনের সামনের সারির এবং ইনকিলাবমঞ্চের সক্রিয় কর্মী। তিনি বলেছেন, কালচারের মাধ্যমে যে ফ্যাসিজম সামনে আসে এবং জাতির ঘাড়ে চেপে বসে এটাইতো আমরা জানতাম না। আপনি বা আমি কতটা জানতাম? জুলাইয়ের মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে, কালচার কিংবা যাদের আমরা হিরো বলি, তাদের আইডল মনে করি। তাদের দ্বারা প্রভাবিত হই। তাদের বেশিরভাগই দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে। তাদের কোন নৈতিকতা নেই। কিনে নিয়ে তাদের মাধ্যমে ফ্যাসিজমের বিস্তার ঘটানো হয়েছে এই দেশে। দৈনিক সংগ্রামের সাথে জুলাইয়ের দেনা পাওনা নিয়ে কথা বলেছেন ডাকসুর এই নেত্রী।

ফাতেমা তাসনি জুমা বলেন, জুলাইয়ের শুরুটা যেভাবে হয়েছিল যে, কোটা আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান। দেশের মানুষ আসলে কোন কিছু পাওয়ার আশায় রাস্তায় নামেনি। তাদের ব্যাপারটা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। জুলুমের বিরুদ্ধে মজলুমের প্রতিবাদ। পরবর্তীতে অবশ্য অনেক কিছু হয়েছে। অনেকে অনেক কিছু পেয়েছে। কিন্তু দেশের মানুষ ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি পেয়েছে। এটাই জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় সফলতা। জুলাইয়ের পর আমরা যেটা দেখেছি, আগে আমাদের কথা বলার স্বাধীনতা ছিল না। মানুষ হাঁসফাঁস করতো। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, দুর্নীতি সব মিলিয়ে জুলাইয়ের পর চলে গেছে সেটা বললে ভুল হবে। আমি বলবো জুলাইয়োর পরও অনেকে দুর্নীতি, চাঁদাবাজিতে জড়িয়েছে তবে সেটা ফাসিবাদের সময়ের মতো না। এখন মানুষ চাইলেই প্রতিবাদ করতে পারে। চাঁদাবাজকে চাঁদাবাজ বলতে পারে। একথা বলার স্বাধীনতাটুকু জুলাই আমাদের দিয়েছে। প্রত্যাশা ছিল সবকিছু ঢেলে সাজাবো। আমরা কোনো কারণে হয়তো করতে পারিনি। আজ হউক কাল হউক জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা পূরণ হবেই। কারণ জুলাইটা শহীদদের পবিত্র রক্তের মধ্য দিয়ে গেছে।

জুলাইয়ের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে ডাকসু নেত্রী বলেন, শতাংশের হিসেব করলে আমি বলবো টু পার্সেন্টও না। তবে আমরা শুরু বা সুচনা করেছি। কাউকে না কাউকে তো শুরুটা করতে হবে। এরপর দশ বছর লাগুক কিংবা পাঁচ বছর লাগুক সেটা পূর্ণতা পাবে।

আমাদের প্রত্যাশা ছিল আমরা সবকিছু ঢেলে সাজাবো। সংস্কার হবে। আমরা নতুন বন্দোবস্তের কথা বলতাম। কিন্তু যে কারণেই হউক আর রাজনৈতিক দলগুলো অনিচ্ছায় হউক কিংবা অপারগতায় হউক কিংবা ফ্যাসিবাদ যেভাবে প্রত্যেকটা জায়গায় বসা ছিল তাদের সরানো যায়নি। সেজন্য পুরো কাজটা হয়নি। তবে আমাদের শুরুটা তো হয়েছে।

ইনকিলাব মঞ্চ আর জুলাইয়ের সম্পর্ক নিয়ে এই নারী নেত্রী বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের অন্তর্নিহীত বিষয় হলো কালচার‌্যাল ফ্যাসিজম থেকে মুক্তি। আপানি আমি কতটা জানতান যে কালচারের মাধ্যমে ফ্যাসিজম বিস্তার ঘটে। জুলাইয়ের মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে যাদের আইডল মনে করি তারা দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে। তাদের মাধ্যমে দেশের মধ্যে ফ্যাসিজম ছড়িয়েছে। তাদের কিনে নিয়ে কাজটি করা হয়েছে। পরবর্তীতে ইনকিলাব মঞ্চ এই প্রত্যাশা নিয়ে যাত্রা শুরু করে যে, এই মঞ্চ ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে কাজ করবে।

তিনি জানান দেন, ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে ইনকিলাব কালচারেল সেন্টার বই আনবে, গান আনবে এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে কাজ করবে। অভিযোগ করে তিনি বলেন, মিডিয়াপাড়াসহ বেশ কিছু জায়গা থেকে এখনো ফ্যাসিজম যায়নি। এর কারণ হলো বাংলাদেশপন্থীদের হাতে টাকা পয়সা কম। একারণে তারা শিল্প সাহিত্যকে ধরে রাখতে পারে না। তাদের মধ্যে সেই আগ্রহটুকুও নেই। তাই মিডিয়াপাড়াকে আমাদের মতো করে পাচ্ছি না। আমাদের মতো করে কাজে লাগাতে পারছি না। তবে আমরা বিশ^াস করি একদিন সেই জায়গাগুলোতে বাংলাদেশপন্থী মানুষেরা আসবে।

ডাকসুর মাধ্যমে জুলাইকে কতটুকু এগিয়ে নিতে পেরেছেন এমন প্রশ্নে জনপ্রিয় এই ডাকসু নেত্রী বলেন, আসলে ডাকসুটাই হচ্ছে জুলাইয়ের সৃষ্টি। জুলাই না এলে এমন ডাকসু পেতাম না। এরমধ্যে আমরা একাডেমিক বই আনার চেষ্টা করছি। আরও কিছু শিল্পসাহিত্য নিয়ে কাজ করছি। আমরা জানি বিপ্লবটা লেগে থাকে মানুষের মস্তিষ্কে মননে। চিন্তায় চেতনায়। আমাদের চিন্তাতেও জুলাইকে একাডেমিয়াতে নিয়ে যাওয়া। ডাকসুর সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক ও আমি মিলে কাজগুলো করছি। এগিয়ে নিচ্ছি। আমরা একটা জিনিস নিয়ে কাজ করছি সেটা হলো-- অনেকেই একাত্তর আর চব্বিশকে মুখোমুখি দাঁড় করাতে চায়। আমরা চাই সেই ন্যারেটিভ ভেঙে দিতে। একাত্তর আর চব্বিশ মুখোমুখি না। একাত্তর না এলে চব্বিশ আসতো না তেমনি চব্বিশ না এলে একাত্তরের পূর্ণতা পেত না।

চব্বিশের জুলাইয়ের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের এই নেত্রী বলেন, আমাদের প্রত্যেকের কাছে হাসিনার পালিয়ে যাওয়াটা-ই সবচেয়ে বড় স্মৃতি। তবে আমার পছন্দের মুহূর্তটা হচ্ছে-- ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে যেদিন রাতে মেয়েরা বের হয়ে এলো। আমি হলের বাইরে থাকতাম। তাদের সাথে মিছিল করতে করতে ভিসি চত্ত্বরে এলাম। তখন রাত ১২টার কাছাকাছি। সবাই স্লোগান দিলো তুমি কে? আমি কে? রাজাকার! রাজাকার! কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরচার স্বৈরাচার। হাসিনাকে ঢাবির মাটিতে স্বৈরাচার বলা শোনাটা বড় একটা প্রাপ্তি ছিল। এবং ওই মুহূর্তটা মনে হয়েছিল এবার কিছু একটা হবে। পরের দিন আমাদের ওপর আক্রমণ হয় এবং আমিও আহত হই। সেদিন মনের মধ্যে রাগ হয় এবং আমি একটা পোস্ট দেই। আজকে হয়তো নয়তো আর কোনোদিন না। পরে অবশ্য আমাকে ওই পোস্ট ডিলেট করতে হয়েছে। তবে ওই কাজটা নিয়ে আমি সব সময় গর্ববোধ করি। এবং করবো এই কারণে যে আমাদের হাত দিয়েই শুরুটা হয়েছে।